কালিহাতী পৌরসভায় আ.লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা প্রচারণায় ॥ বিএনপি নিরবে

515

কাজল আর্য ॥
মেয়াদ উত্তীর্ণ পৌরসভাগুলোর নির্বাচন দ্বিতীয় ধাপে আগামী জানুয়ারি মাসে হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। টাঙ্গাইলের ৮টি পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। জেলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার কালিহাতী পৌরসভায় বইছে নির্বাচনী হাওয়া। মেয়র পদে বিভিন্ন দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা মাঠে কাজ করছেন। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীরা মাঠে তেমনটা সরগরম না করলেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা প্রচার প্রচারনায় ব্যস্ত হয়েছেন।
সম্ভাব্য মেয়র ও কাউন্সিল প্রার্থীরা ব্যানার, পোস্টার ও ফেসবুকের মাধ্যমে নিজেদের প্রার্থীতা জানান দিয়েছেন। সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত পৌর এলাকায় চায়ের স্টল, বাজার ও জনাকীর্ণস্থানগুলোতে মানুষের কাছে দোয়া চাচ্ছেন এবং দেখা সাক্ষাৎ করছেন। করছেন মোটরসাইকেল শোডাউন এবং মিটিং মিছিল। অনেকে আত্মীয়স্বজন এবং ব্যক্তিগত পক্ষের লোকদের সাথে নিয়মিত মতবিনিময় যোগাযোগ রাখছেন। পাশাপাশি উপজেলা, জেলা এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নেতাদের কাছে দৌঁড়ঝাপও দিচ্ছেন।
মেয়র পদে এই পৌরসভায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ৮ জনের নাম শোনা যাচ্ছে। নৌকার মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে নব্য আওয়ামী লীগ এবং গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকার বিপক্ষে কাজ করা ব্যক্তিরাও রয়েছেন। প্রার্থীদের সাটানো পোস্টার ব্যানারেও প্রকাশ পেয়েছে আওয়ামী রাজনীতির গ্রুপিং। কেউ কেউ স্থানীয় এমপি হাসান ইমাম খান সোহলে হাজারীর ছবি সম্বলিত এবং কেউ কেউ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোজহারুল ইসলাম তালুকদারের ছবি দিয়ে পোস্টার ব্যানার করেছেন। এতে কে কার অনুসারি সেটা সহজেই প্রতিয়মান হচ্ছে। দীর্ঘ ২ বছর পর অনুষ্ঠিত সম্প্রতি উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভার মাধ্যমে এমপি এবং আওয়ামী লীগের সভাপতির মধ্যে দূরত্ব কমেছে।
মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক শরীফ আহামেদ রাজু। দলের নিবেদিত প্রাণ সদা হাসোজ্জল রাজু কালিহাতী উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। বিগত ২০০১-২০০৬ বিএনপির শাসনামল ও ১/১১ সময়ে দলের দুর্দিনে নির্যাতিত এবং হামলা মামলার শিকার হয়েছেন। করেছেন কারাবরণ। বিগত ২০০৪ সালের (২১ আগস্টের) সেই জনসভায় ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। গ্রেনেডের স্প্রিন্টারের আঘাতও পেয়েছিলেন। রাজনীতির পাশাপশি শরীফ আহামেদ রাজু শ্রমিক সংগঠনের সাথে জড়িত। তিনি দলীয় কর্মকান্ড এবং যেকোন নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীরে পক্ষে নিরলস কাজ করেন। রাজু ব্যাপক প্রচার প্রচারণা শুরু করেছেন।
আসলাম সিদ্দিকী ভুট্রো উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এবং কমিউনিটি পুলিশিং এর সাধারণ সম্পাদক। তিনি গত নির্বাচনেও মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। এবারো আছেন শক্ত অবস্থানে। করোনাকালীন সময়ে তার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বন্ধনের মাধ্যমে অসহায় মানুষকে সাধ্যমতো সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। পোস্টার, ব্যানার সাটিয়ে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে নিয়মিত গণসংযোগ করে চলেছেন। তিনি বিভিন্ন সামাজিক সংঠনের সাথেও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
কালিহাতী পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল মালেক তালুকদার নিয়মিত প্রচার প্রচারণা করছেন। তার কর্মীদের নিয়ে তিনি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের কাছে দোয়া ও সমর্থন চাচ্ছেন।
কালিহাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য হুমায়ুন খালিদ মনোনয়ন প্রত্যাশী হয়ে তার মতো করে প্রচারণা চালাচ্ছেন। গত পৌরসভা নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে নির্বাচন করে তিনি পরাজিত হন। পৌরসভার দক্ষিণ এলাকা সিলিমপুর, নিশ্চিতপুর ও ঝগড়মান এলাকায় তার রয়েছে নিজস্ব ভোটব্যাংক।
কালিহাতী উপজেলা যুবলীগের সভাপতি নুরন্নবী সরকার মনোনয়ন প্রত্যাশী হয়ে মাঠে নেমেছেন। করছেন প্রচার ও গনসংযোগ। তিনি বেশ কিছু দিন আগেই মেয়র পদের প্রার্থীতা ঘোষণা দেন।
কালিহাতী উপজেলা ছাত্রলীগের দীর্ঘদিনের আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান মনির মনোনয়ন প্রত্যাশী হয়ে নিয়মিত গনসংযোগ ও জোরেসোরে প্রচার প্রচারনা করছেন। তিনি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে মানুষের সাথে দেখা করে কুশল বিনিময় করছেন। চাচ্ছেন সমর্থন। মনির পৌর ছাত্রলীগের আহ্বায়ক ছিলেন। হামলা মামলারও শিকার হয়েছেন। বন্যায় পৌর এলাকার অসহায় মানুষের মধ্যে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেন।
মিন্টু সরকার বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের কালিহাতী উপজেলার সভাপতি ও হামিদপুর ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। তিনি দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলেন। দেশে এসেই নিজেকে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা দিয়েছেন। করোনা ও বন্যায় পৌর এলাকায় ত্রাণ সহযোগিতাও করেছেন।
কালিহাতী পৌর আওয়ামী লীগের সদস্য মানিক দেবনাথও এবার দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী। পোস্টার, ব্যানার দিয়ে আলোচনায় এসেছেন এই নতুন মুখ। তিনি এরআগে কাউন্সিলর নির্বাচন করেছিলেন।
অধিকাংশ মনোনয়ন প্রত্যাশীরা টিনিউজকে বলেন, দলের কাছে মনোনয়ন চাইবেন। পেলে নির্বাচন করবেন। না পেলে দল যাকে দিবে তার নির্বাচন করে দিবেন। আবার দুই-একজনের কথা শোনা যাচ্ছে মনোনয়ন না পেলেও মাঠে থাকবেন। বেশি সংখ্যক প্রার্থী থাকায় দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা দোটানা এবং বিভক্ত হয়ে পড়ছেন। পৌরসভার ১ নং সদর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন টিনিউজকে বলেন, আমরা কোন ব্যক্তির পক্ষে নই। তবে চাই দুর্দিনের অরিজিনাল আওয়ামী লীগার মনোনয়ন পাক। এমপি ও সভাপতি একত্রে মিলে মনোনয়ন ও কাজ করলে তবেই মেয়র পদে বিজয়ী হওয়া সম্ভব।
কালিহাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোজহারুল ইসলাম তালুকদার টিনিউজকে বলেন, বৃহদ ও ক্ষমতাসীন দলে একাধিক প্রার্থী থাকবে এটাই স্বাভাবিক। মনোনয়নের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক ত্যাগী পরীক্ষিতদের দল মূল্যায়ন করবে। বিএনপির প্রার্থীকে পরাজিত করে যিনি মেয়রের চেয়ারে বসতে পারবেন সেই যোগ্য ব্যক্তিই আশা করি মনোনয়ন পাবেন।
মনোনয়নের বিষয়ে কথা হয় স্থানীয় সংসদ সদস্য হাছান ইমাম খান সোহেল হাজারীর সাথে। তিনি টিনিউজকে বলেন, আমাদের দলের যারা মনোনয়ন প্রত্যাশী হয়ে মাঠে নেমেছেন তারা সবাই যোগ্য। এরমধ্যে থেকে অধিকতর যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হবে। সর্বোপরি দলীয় প্রধান জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রার্থীই আমাদের প্রার্থী।
এদিকে বিগত ২০১৬ সালের সর্বশেষ কালিহাতী পৌরসভা নির্বাচনে তৎকালীন উপজেলার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনসার আলী বিকম (বর্তমানে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান) মেয়র পদে নৌকা প্রতিক নিয়ে লড়ে ঢাকা বিভাগে একমাত্র তিনিই পরাজিত হন। আওয়ামী লীগের গ্রুপিং এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর সুবিধা পেয়ে জয়লাভ করেন বিএনপি মনোনিত প্রার্থী আলী আকবর জব্বার। এবার পৌর নির্বাচনে বর্তমান মেয়র ও উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আকবর জব্বারই মূল প্রার্থী। তিনি এরআগে কালিহাতী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার প্রশাসক এবং চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়া পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর বিএনপি নেতা মোহাম্মদ আলী মনোনয়ন প্রত্যাশী হয়ে জানান দিয়েছেন। কালিহাতী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক শুকুর মাহমুদ টিনিউজকে বলেন, দলীয় মনোনয়নের ব্যাপারে সময় মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিগত ১৯৯৮ সালের (১৫ ডিসেম্বর) কালিহাতী ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পৌরসভায় রুপান্তর করা হয়। কালিহাতী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা তাসনীম জাহান টিনিউজকে বলেন, বিগত ২০২১ সালের (২৪ ফেব্রুয়ারি) বর্তমানদের মেয়াদ শেষ হবে। এর আগের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পৌরসভায় সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী মোট ভোটার ২৮ হাজার ৫৫২ জন। এরমধ্যে পুরুষ ১৩ হাজার ৯৬৯ জন ও মহিলা ১৪ হাজার ৫৮৩ জন।
এছাড়া টাঙ্গাইল সদর, ধনবাড়ী, মধুপুর, মির্জাপুর, ভূঞাপুর, সখিপুর ও গোপালপুর পৌরসভাগুলোতে বইছে নির্বাচনী বাতাস। নবীন প্রবীণ মনোনয়ন প্রত্যাশীরা মাঠে আশা ব্যক্ত করে তাদের প্রার্থীতা জানান দিচ্ছেন। সেই সাথে পুরো জেলায় বইছে নির্বাচনী রাজনৈতিক হাওয়া।

 

 

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ