কালিহাতীর ৯ ইউপির ৮টিতেই নৌকার বিষফোড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরা

2,311

স্টাফ রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় তৃতীয় ধাপে রোববার (২৮ নবেম্বর) অনুষ্ঠিতব্য ১০টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৪৫৭জন প্রার্থীর মধ্যে ৩০ জন প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন। এদের মধ্যে চেয়ারম্যান পদে ৮ জন, সংরক্ষিত সদস্য পদে ২ জন এবং সাধারণ সদস্য পদে ২০ জন। ৯টি ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে ৩০ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন। ৯টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতিকের ৯ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করলেও অন্তত ৮টি ইউনিয়নের প্রার্থীরা অস্বস্তিতে রয়েছেন। ওই সকল ইউনিয়নে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নৌকা প্রতিকের জন্য বিষফোড়া হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
জানা যায়, দশকিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থী কালিহাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক ভূইয়া। তিনি দুইবারের বর্তমান চেয়ারম্যান। মালেক ভূইয়া একবার সরাসরি ভোটে ও একবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। তার বিপক্ষে শক্ত স্বতন্ত্র প্রার্থী নজরুল ইসলাম আওয়ামী লীগ বিরোধীদের সমর্থন পাওয়ায় তার ভাল অবস্থান তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগ বিরোধীরা এককাট্টা নৌকা ডুবাতে। মালেক ভূইয়ার রাজনৈতিক প্রভাব ও বিত্তবৈভবতার বদলৌত ছাড়া জয়লাভ করা প্রায় অসম্ভব। গত উপজেলা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আনছার আলীর আনারস মার্কায় নির্বাচন করে নৌকা মার্কার বিরোধীতা করায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ। একই মুখে দুই কথা বিশ্বাস করতে পারছেন না দশকিয়া ইউনিয়নের ভোটাররা। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে গিয়ে জোড় ভোট প্রার্থনা করতে পারছে না নৌকার পক্ষে। মালেক ভূইয়া ভোট প্রার্থনা করতে গিয়ে বিব্রত হচ্ছেন বিভিন্ন জায়গায়। ভোট সুষ্ঠু নিরপেক্ষ হলে স্বতন্ত্র প্রার্থী নজরুল ইসলাম জয়লাভ করবে মনে করেন ভোটাররা।
বল্লা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনীত নৌকা প্রতিকের প্রার্থী ফরিদ আলহামদ নতুন সমীকরণে আসলেও তারজন্য বিষফোড়া হয়ে উঠছেন বল্লা সমাজের মনোনীত প্রার্থী প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব বয়োঃবৃদ্ধ শুকুর মাহমুদ। যদিও বল্লা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ তাদের সর্বশক্তি এবং কৌশল প্রয়োগ করে যে কোনমূল্যে নৌকা প্রতিককে বিজয়ী করতে মরিয়া হয়ে ওঠেছেন। তারপরও ওই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বল্লা সমাজের প্রার্থী শুকুর মাহমুদ ফ্যাক্টর হিসাবে অভিহিত হচ্ছেন।
নাগবাড়ী ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতিকের প্রার্থী আব্দুল কাইয়ুম বিপ্লবের বিপক্ষে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন বর্তমান চেয়ারম্যান মাকসুদুর রহমান মিল্টন সিদ্দিকী। মিল্টন সিদ্দিকী ও তার জনপ্রিয়তা ও কৌশলের কাছে পেরে উঠতে না পারলে ক্লিন ইমেজের আব্দুল কাইয়ুম বিপ্লব ধরাশায়ী হতে পারেন। অপরদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে দাবীকৃত ইথার সিদ্দিকীর ও যথেষ্ট জনসমর্থন আছে বলে ধারনা করা হচ্ছে। মূলত নাগবাড়ী ইউনিয়নে ত্রিমুখী নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অনেকেই টিপ্পনী কেটে বলছেন কেউ কারে ছাড়ে নাকো সমানে সমান।
কোকডহরা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতিকের চেয়ারম্যান প্রার্থী নুরুল ইসলাম বর্তমান চেয়ারম্যান স্বতন্ত্র হিসাবে আবির্ভূত নজরুল ইসলামের জনপ্রিয়তা ও সমর্থকদের কারণে অনেকটাই কোনঠাসা। তবে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নুরুল ইসলামকে বিজয়ী করতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। যদি নির্বাচন সুষ্ঠু হয় তবে এই ইউনিয়নে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী স্বতন্ত্র প্রার্থী নজরুল ইসলাম।
সহদেবপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতিকের প্রার্থী মুখলেছুর রহমান ফরিদকে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করতে হচ্ছে বর্তমান চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমান বালা’র সাথে যিনি বিগত সময়ে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতিক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে না আসায় তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নিজের প্রার্থীতা ঘোষণা করেছেন। বিএনপি’র দূর্গ হিসাবে পরিচিত সহদেবপুরে মাসুদুর রহমান বালা নতুন কোন চমক দেখালে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
সল্লা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতিকে আব্দুল আলীমের ভূগৌলিক সুবিধা থাকায় বিশাল ভোট ব্যাংক আছে। তার বিপক্ষে পারিবারিক ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান শামীম আল মামুনের ভাল অবস্থান থাকলেও ওই ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল আলীম নৌকা প্রতিকে নতুন চমক দেখাতে পারেন।
গোহালিয়াবাড়ী ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতিকের প্রার্থী আব্দুল হাই আকন্দের বিপক্ষে শক্ত অবস্থানে আছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মতিউল আলম তালুকদার। স্থানীয় কোন্দল ও বর্তমান চেয়ারম্যান হযরত আলী তালুকদার নৌকা প্রতিক না পাওয়ায় তার অনুসারীদের ক্ষুব্ধ হওয়ায় আব্দুল হাই আকন্দকেও জিততে যথেষ্ট বেগ পেতে হতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন।
দূর্গাপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতিকের প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান এসএম আনোয়ার হোসেনের মাথাব্যাথার কারণ হয়ে উঠেছেন সাবেক চেয়ারম্যান স্বতন্ত্র প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম। সিরাজুল ইসলামের রয়েছে বিশাল একটি সমর্থক গোষ্ঠী। ওই ইউনিয়নে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সিরাজুল ইসলামের সফল হওয়াকে একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যায় না।
নারান্দিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতিকের প্রার্থী মাসুদ তালুকদার অভিজাত তালুকদার পরিবারের সন্তান তার বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী আছে। উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোজহারুল ইসলাম তালুকদারসহ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা নৌকার সমর্থনে পুরো ইউনিয়ন চষে বেড়াচ্ছেন। তবে মাসুদ তালুকদারের বিপক্ষে শক্ত অবস্থানে আছেন বিএনপি’র সাবেক চেয়ারম্যান বর্তমানে স্বতন্ত্র প্রার্থী মহর আলী। নির্বাচনী ভোটের মাঠে এখানেও। আওয়ামী লীগ ও নৌকার প্রার্থীর জন্য ঘটে যেতে পারে কোন অঘটন।
এককথায় বলা যায়, রোববার (২৮ নভেম্বর) কালিহাতী উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অন্ততপক্ষে ৮টি ইউনিয়নে সরকার দলীয় নৌকা প্রতিকের প্রার্থীরাই অস্বস্তিতে রয়েছেন। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নৌকা প্রতিকের জন্য বিষফোড়া হিসাবে আবির্ভূত হয়েছেন।
গত (১১ নভেম্বর) পর্যন্ত মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময় ছিল। উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মিসবাহ উদ্দিন আহমেদ টিনিউজকে জানান, তৃতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে কালিহাতী উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে রোববার (২৮ নভেম্বর)। নির্বাচনে ৩৯ জন চেয়ারম্যান প্রার্থীর দাখিলকৃত বৈধ মনোনয়নের মধ্যে ৮ জন চেয়ারম্যান প্রার্থী তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। এর মধ্যে বল্লা ইউনিয়নে স্বতন্ত্র প্রার্থী ইসমাইল হোসেন, পাইকয়া ইউনিয়নে জসিম উদ্দিন ও সেকান্দর আলী, সহদেবপুর ইউনিয়নে আব্দুস ছালাম ও ইসমাইল হোসেন, নারান্দিয়া ইউনিয়নে ইকবাল হোসেন রিন্টু ও জামাল হোসেন এবং দশকিয়া ইউনিয়নে রাসেল ভূঁইয়া। এছাড়াও সংরক্ষিত সদস্য পদে ১০৩ জনের মধ্যে ২ জন এবং ৩১৫ জন সাধারণ সদস্য পদে প্রার্থীর মধ্যে ২০ জন প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেয়ায় প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়ালো ৪২৭ জনে। এরমধ্যে চেয়ারম্যান পদে পাইকড়া ইউনিয়েনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আজাদ হোসেনের বিপরীতে কোন প্রার্থী না থাকায় তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে হয়েছেন।
অপরদিকে কালিহাতী উপজেলার ১০ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে গত (১২ নভেম্বর) প্রার্থীদের মাঝে প্রতিক বরাদ্দ করা হয়। একই দিন উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ৪ জনকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিস্কার করা হয় বলে কালিহাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক আব্দুল কাদের নিশ্চিত করেছেন।
বহিস্কৃতরা হলেন- নারান্দিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও সহসভাপতি সাদেক আলী, নাগবাড়ী ইউনিয়নে উপজেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানব সম্পদ বিষয়ক সম্পাদক মাকসুদুর রহমান মিল্টন সিদ্দিকী, দূর্গাপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সিরাজুল ইসলাম ও দশকিয়া ইউনিয়নে উপজেলা আওয়ামী লীগ সদস্য মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম।
কালিহাতী উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে ও ১০টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যানসহ সকল পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রচারণায় মুখরিত হচ্ছে বিভিন্ন ইউনিয়নের জনপদ। ওই নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীরা একে অপর প্রার্থীদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনছেন।
কালিহাতী উপজেলা প্রশাসন, স্ব স্ব রিটার্নিং অফিসার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচন অবাদ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু করতে মাঠে রয়েছেন।

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ