রবিবার, সেপ্টেম্বর 20, 2020
Home টাঙ্গাইল কালিহাতী কালিহাতীতে শিক্ষক এমপিও ভুক্তির নামে প্রধান শিক্ষকের বাণিজ্যের অভিযোগ ॥ চলছে তদন্ত

কালিহাতীতে শিক্ষক এমপিও ভুক্তির নামে প্রধান শিক্ষকের বাণিজ্যের অভিযোগ ॥ চলছে তদন্ত

স্টাফ রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ে কর্মরত না থাকা শিক্ষক ও কর্মচারীদের এমপিও ভুক্তির মাধ্যমে কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত আরিফুর রহমান সিকদার লিটন কালিহাতী উপজেলার বীরবাসিন্দা ইউনিয়নের কস্তুরীপাড়া আর্দশ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। সভাপতিসহ নিয়োগ বোর্ডের সদস্যদের সীল আর স্বাক্ষর জাল করে এই জালিয়াতি চালানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। গত সোমবার (১৭ আগস্ট) অভিযোগের তদন্ত করেছেন মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর ড. মনোয়ার হোসেন।
জানা যায়, বিগত ১৯৯৯ সালে কালিহাতী উপজেলার কস্তুরী পাড়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় কস্তুরী পাড়া আদর্শ নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের বিধি আর ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্তে ৬ জন শিক্ষক আর কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয় বিদ্যালয়টিতে। বিগত ১৯৯৯ সালের (৫ ডিসেম্বর) স্মারক নং ক,আ,অ,বা,বি /৪৭/৯৯/৪৭ বিধি অনুযায়ী আর ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ডাক্তার আবুল কাসেম শিকদার স্বাক্ষরিত ওই শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগপত্র সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়। এতে নিয়োগপ্রাপ্ত হন- আরিফুর রহমান সিকদার লিটন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, হায়দার আলী, শামস উদ্দিন, কানিজ ফাতেমা আর জ্যোৎস্না রানী। যথারীতি তারা যোগদানপত্র জমা দিয়ে শুরু করেন বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। পরবর্তীতে বিদ্যালয়ের স্বার্থে বালিকা বাদ দিয়ে কস্তুরীপাড়া আদর্শ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় নামকরণ করা হয়। এ স্বত্তেও বিদ্যালয়টি সরকারী এমপিও ভুক্ত না হওয়ায় কর্মরত শিক্ষক কর্মচারীগণ মানবেতর জীবন যাপন করেও বিদ্যালয়টি চালু রাখতে নিরলস চেষ্টা অব্যাহত রাখেন।
পরবর্তীতে ২০২০ সালের (২৯ এপ্রিল) নতুন এমপিও কোড দিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউসি)কে নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। চুড়ান্ত অনুমোদিত তালিকার মধ্যে নিম্ন মাধ্যমিক ৪৩০টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৯৯১টি এছাড়াও কলেজ পর্যায়ে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ৯২টি এবং ডিগ্রী স্তরে ৫২টি আর স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে ৬৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সর্বমোট ১৬৩৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ওই তালিকায় স্থান পায় কস্তুরীপাড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়। তবে তাতে অসর্তকতা বশত কস্তুরীপাড়া আদর্শ নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় লেখা হয়। এছাড়াও সরকারী ঘোষনা অনুযায়ী বিগত ২০১৯ জুন হতে এমপিও ভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। বঞ্চিতদের অভিযোগ, বিদ্যালয় আর শিক্ষক কর্মচারীর এমপিও ভুক্ত হওয়ার সুযোগ নিয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আরিফুর রহমান সিকদার লিটন অর্থ লিপ্সায় মেতে উঠেন। তিনি শিক্ষক-কর্মচারীর নাম এমপিও ভুক্ত করণের জন্য মোটা অংকের উৎকোচ দাবী করে বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক কর্মচারীদের চাপ দিতে থাকেন। একই সাথে লাখ লাখ টাকা এরিয়া বিল পাইয়ে দেয়ার প্রলোভনও দেখান তিনি।
তবে এতে কয়েকজন শিক্ষক অস্বীকৃতি জানালে প্রধান শিক্ষক নেন জালিয়াতির আশ্রয়। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের সভাপতি আবুল কাসেম শিকদারের স্বাক্ষর জাল করাসহ ওই সময়ের নিয়োগ দেখিয়ে ও ৬০ লাখ টাকার বিনিময়ে অন্য ৫ জনের নাম এমপিও ভুক্তির জন্য কালিহাতী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে জমা দেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষক এমপিও ভুক্তির জন্য পাঠানো নামের তালিকায় আসেন ফরিদ আহমেদ, শহিদুল ইসলাম, জুলহাস উদ্দিন, আতিকুর রহমান, ইকবাল হোসেন ও মোস্তাফিজুর রহমান। এছাড়াও বিদ্যালয়ের কর্মরত অন্য ৪ জন শিক্ষকের কাজ থেকে ৮ লাখ টাকা করে মোট ৩২ লাখ টাকা ও দপ্তরী হিসাবে মোস্তাফিজুর রহমানের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহণ করার অভিযোগ রয়েছে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
বঞ্চিতদের অভিযোগ, দীর্ঘ ১৮ বছর যাবৎ টাঙ্গাইল শাহীন কোচিং সেন্টারে কর্মরত ফরিদ আহমেদকে সহকারি শিক্ষক গণিত, বিগত ২০০২ সাল থেকে কালিহাতীর গোয়ারিয়া এবতেদায়ী মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক হিসাবে কর্মরত ও চলতি বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত ২৩০০ টাকা করে সরকারী ভাতা নিয়মিত গ্রহণকারী জুলহাস উদ্দিনকে সহকারী শিক্ষক ইসলাম ধর্ম, গত ২০ বছর যাবৎ বিভিন্ন কোম্পানীর সেলসম্যান ও ব্র্যাক নামক এনজিওতে কর্মরত ও গোপালপুর উপজেলার ভাদুরীর চর গ্রামের আতিকুর রহমানকে শরীরচর্চা শিক্ষক, কালিহাতীর বাসিন্দা ও আদম ব্যবসায়ি শহিদুল ইসলামকে সহকারি শিক্ষক কৃষি, নুরুল ইসলাম বিজ্ঞান, ১৯ বছর যাবত সিরাজগঞ্জ স্যাপ বাংলাদেশ নামক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ও গোপালপুর উপজেলার পূর্ব নুইঠার চর গ্রামের ইকবাল হোসেনকে করনিক, প্রায় ১৭ বছর সৌদি আরবে বসবাস শেষে চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে দেশে ফিরে আসা মোস্তাফিজুর রহমানকে দপ্তরী হিসাবে অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও সম্প্রতি চালু হওয়া ভৌত বিজ্ঞান বিষয়টির শিক্ষক প্যাটান বর্হিঃভুত শিক্ষক হিসাবে বিগত ১৯৯৯ সালে নিয়োগ দেখানো নুরুল ইসলাম আর সমাজ বিজ্ঞানে হায়দর আলীকে এমপিও ভুক্ত করণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
তৎকালিন নিয়োগ কমিটি আর সভাপতির স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে এমপিও ভুক্তির কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন প্রধান শিক্ষক বলে অভিযোগ করেছেন কস্তুরীপাড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ডা. এম.এ.কাশেম শিকদার। যার শিকার হয়েছেন তাদের নিয়োগ দেয়া আর প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ আর শামস উদ্দিন নামের দুই শিক্ষক। বৈধ শিক্ষকদের বাদ দিয়ে টাকার নতুন শিক্ষকদের স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া ও এমপিও ভুক্তিকরণ চেষ্টার তীব্র নিন্দা জানানোসহ অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের শাস্তি দাবি করেছেন তিনি। তিনি আরো জানান, এর আগে আরিফুর রহমান সিকদার প্রধান শিক্ষক কস্তুরী পাড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা শিক্ষা অফিস স্বারক নং জে.শি.অ/টাং-৯৮৫ তারিখ ২৩/৬/২০২০ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। মোহাম্মদ বায়েজিদ হোসেন গবেষনা কর্মকর্তা জেলা শিক্ষা অফিসকে আহবায়ক ও আসাদুজ্জামান সহকারী পরিদর্শক, ইমরান হাসান সহকারী পরিদর্শককে সদস্য করে জেলা শিক্ষা অফিসার ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটিকে জরুরী ভিত্তিতে ও সরেজমিন তদন্ত পূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য জেলা শিক্ষা অফিসার লায়লা খানম স্বাক্ষরিত পত্রে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তদন্ত কমিটি যথারীতি তদন্ত কাজ শুরু করে তদন্ত কমিটির আহবায়ক মোহাম্মদ বায়েজীদ হোসেন একটি পত্র প্রেরণ করেছেন যাতে উল্লেখ ছিল গত (১ জুলাই) বেলা ১১টায় সরেজমিনে তদন্ত কার্য পরিচালিত হবে। সংশ্লিষ্ট সকলকে নির্ধারিত দিন ও সময়ে প্রয়োজনীয় প্রমানাদিসহ উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। যার স্বারক নং.জেশিঅ/টাং ৯৯১ তারিখ.২৫-০৬-২০২০। অপরদিকে গত (৩০ জুন) তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক তদন্তের তারিখ পুন:নির্ধারণ করে (৮ জুলাই) তারিখ ধার্য করা হয়। যার স্মারক নং- জে.শি.অ/টাং-১০১৩। গত (১৭ আগস্ট) সোমবার অভিযোগের তদন্তে আসেন মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর ড. মনোয়ার হোসেন।
কস্তুরীপাড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আরিফুর রহমান সিকদার লিটনের জালিয়াতি, উৎকোচ গ্রহণ আর প্যাটান বর্হিঃভূত শিক্ষক-কর্মচারী এমপিও ভুক্তির বিষয়ে কালিহাতী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রোকেয়া খাতুন বলেন, স্বল্প সময়ে এমপিও ভুক্তির কাগজপত্র সরবরাহের নির্দেশনা থাকায় সঠিকভাবে কাগজপত্র যাচাই বাছাই করা দুস্কর ছিল। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছেন।
তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়ে কোন বক্তব্য দেননি অভিযোগের তদন্তকারি কর্মকর্তা ও মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর ড. মনোয়ার হোসেন। তবে সুষ্ঠু আর নিরপেক্ষ তদন্তের আশ^াস দিয়েছেন তিনি।
এ ব্যাপারে বীরবাসিন্দা ইউনিয়নের কস্তুরীপাড়া আর্দশ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আরিফুর রহমান সিকদার লিটনের সাথে মুঠোফোনে বার বার যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। বর্তমানে এ ঘটনার তদন্ত চলছে এই অজুহাতে অভিযোগের বিষয়ে গণমাধ্যমকে কোন বক্তব্য দেননি প্রধান শিক্ষক আরিফুর রহমান সিকদার লিটন।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল-৪ কালিহাতী আসনের সংসদ সদস্য হাছান ইমাম খান সোহেল হাজারী জানান, কোন জালিয়াত বা প্রতারকের কোন স্থান কালিহাতীতে নাই। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক যদি কোন অন্যায় বা অনৈতিক কাজের সাথে যুক্ত থাকেন, তাহলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। অনিয়ম ও দূর্নীতিবাজদের সাথে শেখ হাসিনা সরকার কোন আপোষ করে না। সে যে দলের বা যতবড় শক্তিশালীই হোক না কেন তাকে শাস্তি পেতেই হবে।
এদিকে আরিফুর রহমান সিকদারের নিয়োগ জালিয়াতি ও এমপিও ভুক্তি বানিজ্য বিষয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করে স্থানীয়রা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ