কালিহাতীতে বিজয় দিবসে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি ॥ ভুল ইতিহাস শিখছে প্রজন্ম

149

সোহেল রানা, কালিহাতী ॥
শহীদ মিনারের সৃষ্টি ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। কিন্তু টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে পাল্টে গেছে এই সংজ্ঞা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস কিংবা বিজয় দিবসে কালিহাতীবাসীর শ্রদ্ধা জানানোর একমাত্র স্থান কালিহাতী আর.এস সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে অবস্থিত শহীদ মিনার। কারণ স্বাধীনতার ৫১ বছরে কালিহাতী উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নির্মিত হয়নি কোনো স্মৃতিস্তম্ভ। এমনকি এ ব্যাপারে নেই সুস্পষ্ট কোনো উদ্যোগও। এতে করে ভুল ইতিহাস শিখছে ও জানছে বর্তমান প্রজন্ম।
মুক্তিযুদ্ধের অনেক গৌরবদীপ্তের সাক্ষী টাঙ্গাইলের কালিহাতী। অথচ এই অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য এখানে নেই কোনো স্মৃতিস্তম্ভ! এটি একই সঙ্গে বিস্ময়কর ও হতাশাজনকও। নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস পৌঁছানো এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শনের স্বার্থে কালিহাতীতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ থাকা উচিত ছিল, যা হয়নি স্বাধীনতা লাভের ৫১ বছরেও। সকল দিবসে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের ফলে কি শিখছে কালিহাতীর নতুন প্রজন্ম? সেটি জানতেই কথা হয় কালিহাতী আর এস সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র সিয়াম ইসলামের সঙ্গে।




সিয়াম ইসলাম টিনিউজকে বলেন, (২৬ মার্চ) ও (১৬ ডিসেম্বরে) একাত্তরের শহীদদের শ্রদ্ধায় আমরা ফুল দেই স্কুলের এই শহীদ মিনারে। এই দুই দিবসে স্মৃতিসৌধে ফুল দেওয়া যে নিয়ম এটা জানা নেই। আজ জানলাম। ছোটবেলা থেকেই আমরা জানি সকল দিবসে শহীদ মিনারেই ফুল দিতে হয়। একই শ্রেণীর শিক্ষার্থী আনিকা ও তন্নীও বলে একই কথা। তারাও সকল জাতীয় দিবসেই শহীদ মিনারে ফুল দেয়। তাদেরকে কেউ কখনো বলেননি শুধু (২১ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শহীদ মিনারে ফুল দিতে হয়। আর (২৬ মার্চ) মহান স্বাধীনতা দিবস ও (১৬ ডিসেম্বর) মহান বিজয় দিবসে স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের শ্রদ্ধা জানানোটাই নিয়ম।
কালিহাতীতে উল্লেখিত দিবসগুলো শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করা হলেও স্মৃতিস্তম্ভ না থাকায় প্রজন্ম জানছে ভুল ইতিহাস এবং একাত্তরে শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাস জানাও উপেক্ষিত হচ্ছে।




এ বিষয়ে কালিহাতী আর এস সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান তালুকদার টিনিউজকে বলেন, (২১ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে কালিহাতী আর এস সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শহীদ মিনারেই ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। একইভাবে বিজয় দিবসসহ অন্যান্য জাতীয় দিবসগুলোতে উদযাপন কমিটির সিদ্ধান্তনুযায়ী এই প্রতিষ্ঠানের শহীদ মিনারেই ফুল দেওয়া হচ্ছে বহু আগে থেকে। এছাড়াও দিবসগুলোর সকল অনুষ্ঠান এই প্রতিষ্ঠানেই পালন বা উদযাপন করা হয়। কালিহাতীতে আলাদা স্মৃতিসৌধ বা স্মৃতিস্তম্ভ না থাকায় শহীদ মিনারেই ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর কথা বলেন তিনি। কালিহাতীতে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ হওয়া দরকার। উদযাপন কমিটি যদি মনে করে একটা আলাদা স্মৃতিস্তম্ভ করে ওইখানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবে, আমিও মনে করি এটা আলাদাভাবে স্মৃতিস্তম্ভ করা হলে সুন্দর ও যথার্থ হবে। তিনিও মনে করেন, (২৬ মার্চ) মহান স্বাধীনতা দিবস ও (১৬ ডিসেম্বর) মহান বিজয় দিবসে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করাটাই নিয়ম।
কালিহাতীর সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, বীর মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ ও সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি শিগগিরই এ বিষয়ে সুস্পষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক। অন্তত আগামী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের ইতিহাস এবং শহীদ স্মরণে অন্তত একটি স্মৃতিস্তম্ভ থাকা জরুরী।




এ বিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ কালীন হনুমান কোম্পানির কমান্ডার কাজী আশরাফ হুমায়ুন বাঙাল টিনিউজকে বলেন, স্মৃতিস্তম্ভ হওয়া দরকার এবং আরো বহু আগেই এটি হওয়া উচিত ছিল। কালিহাতী হচ্ছে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর জন্ম, আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর জন্ম, শাহজাহান সিরাজের জন্ম, আবু সাঈদ চৌধুরীর জন্ম। বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে এই নামগুলো জড়িয়ে আছে। সেখানে একটি মুক্তযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ হলে স্তম্ভের এক পাশে তাদের স্মৃতিমাখা কিছু কথা লেখা থাকবে আর অন্য পাশে কোম্পানি কমান্ডারদের বীরত্বের কিছু কথা লেখা থাকলে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হতো। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমরা মনে করি বঙ্গবন্ধুর কন্যার আমলেই সরকারিভাবে এ উদ্যোগ নেওয়া উচিত। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা সবরকম সহযোগিতা করবো। বিষয়টি প্রশাসনের কাছেও আমরা বলেছি।




কোম্পানি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হোসেন টিনিউজকে বলেন, কালিহাতী মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার। এখানে যেহেতু অনেক ইতিহাস, অনেক কালের সাক্ষী, যুদ্ধের সাক্ষী ও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য রয়েছে। তাই অবশ্যই একটি স্মৃতিস্তম্ভ হওয়া দরকার। আমরা আগেও প্রশাসনিকভাবে আবেদন করেছি, দাবি জানিয়েছি। প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ যদি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেন, তবে এ বিজয় দিবস আলাদা তাৎপর্য বহন করবে। আমরাও এ বিষয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেব। বর্তমান সরকারের আমলে কালিহাতীতে ব্যাপক উন্নয়ন হলেও স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি মতো স্পর্শকাতর একটি বিষয় কেন অবহেলিত হলো এটি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন স্থানীয় অনেকেই। সকলেরই প্রত্যাশা কালিহাতীতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ হবে। প্রজন্ম জানবে একাত্তরের কথা। কিন্তু সেটি হতে আর কতদিন অপেক্ষায় থাকতে হবে।




এ বিষয়ে কালিহাতীর উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজমুল হুসেইন টিনিউজকে বলেন, দ্রুতই একটি মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির বিষয়ে উদ্যোগের কথা জানিয়েছিলেন গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের পর। কিন্তু পরবর্তীতে সেটির কোন অগ্রগতির খবর আমাদের জানা নেই। আমরা ভালো একটি জায়গা খুঁজছি। ভালো কোন জায়গা পাচ্ছি না। জায়গা পেলে অচিরেই আমরা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করবো।

ব্রেকিং নিউজঃ