করোনা ভাইরাসের থাবায় লন্ডভন্ড পহেলা বৈশাখ

4

এম কবির ॥
আজ মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) পহেলা বৈশাখে পান্ত-ইলিশসহ ভালো খাবার, নতুন কাপড় পরা, ঝগড়াঝাটি না করা, কারো সঙ্গে লেনদেন না করাসহ নানা নিয়ম মেনে চলার প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে। এতে বছরজুড়ে ভালো থাকা যাবে-এই বিশ্বাস থেকেই পহেলা বৈশাখে টাঙ্গাইলের মানুষ পুরনো রীতি মেনে চলেন।
সরেজমিনে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সরকারি নিদের্শনায় পহেলা বৈশাখ বাংলা বর্ষবরণে টাঙ্গাইলে নেই কোনো প্রস্তুতি। করোনা মোকাবেলায় মানুষ সব ঘরবন্দি। রয়েছেন নানান সংকটে। হয়ে পড়েছেন কর্মহীন। অন্যান্য বছর যদিও প্রাণের এই উৎসবের প্রস্তুতি চলে অনেক আগে থেকেই। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ সর্বত্র বিরাজ করে বৈশাখী আমেজ। দিবসটি উদযাপনে বৈশাখী মেলা, গ্রামীণ খেলা, পান্তা-ইলিশের আয়োজন, হালখাতা, শোভাযাত্রাসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলে বিভিন্ন স্থানে। বর্ষবরণকে ঘিরে টাঙ্গাইলের সর্বত্র পড়ে উৎসবের ধুম।
নবাব মুর্শিদ কুলি খান পয়লা বৈশাখে ‘পুণ্যাহ’ উৎসব চালু করেন। তখন কিছুটা জাতীয় পুঁজির বিকাশ ঘটায় ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি উন্নত অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছিল। এই ব্যবসায়ীরাই পুণ্যাহর আনুষঙ্গিক অনুষ্ঠান হিসেবে ‘হালখাতা’ উৎসব চালু করেন। বাংলার অর্থনীতি ছিল কৃষি নির্ভর। ফলে কৃষকের হাতে নগদ অর্থের জোগান শুধু ফসল কাটার সময়ই আসত। তাই বাধ্য হয়ে তাঁরা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবসায়ী বা দোকানিদের কাছ থেকে বাকিতে কিনতে বাধ্য হতেন। নতুন বছরের প্রথম দিনে হালখাতা উৎসবে বকেয়া অর্থের পুরোটা বা আংশিক পরিশোধ করে হালখাতা বা নতুন খাতায় নাম লেখা হতো। তার মধ্যে অবশ্য আনন্দের উপকরণও ছিল। হালখাতা উপলক্ষে খাওয়া-দাওয়া বিশেষ করে মিষ্টান্ন বিতরণের রেওয়াজ ছিল। সেই রীতি অনুসরণ করে টাঙ্গাইলের ব্যবসায়ীরা পহেলা বৈশাখে বাড়ি কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হালখাতার আয়োজন করেন। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিতদের আপ্যায়নে বাড়িতে তৈরি করা হয় দই-মিঠাইসহ হরেক রকম খাবারের জিনিস। রীতি অনুযায়ী এবারে সেই হালখাতা অনুষ্ঠান করতে না পারায় ভবিষ্যতে ব্যবসা চালানো নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখে টাঙ্গাইলে বিভিন্ন এলাকায় মেলার আয়োজন অনেক পুরনো রীতি। বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতির অন্যতম উপাদান হলো মেলা। গ্রামীণ সমাজ জীবনের পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে মেলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এক সময়। মেলাকে কেন্দ্র করে এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ আসে মেলায়। সামাজিক সম্প্রীতি সৃষ্টির ক্ষেত্রে এই পারস্পরিক যোগাযোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। স্থানীয় কারুশিল্পীদের উৎপাদিত পণ্য এবং কৃষিপণ্যই থাকে গ্রামীণ মেলার মূল বেচাকেনার জিনিস। বাঁশ, বেত, পাট, শোলা, ধাতব, মৃৎ, চামড়া, তন্তুজাত হরেক রকমের কারুপণ্য ও বাচ্চাদের খেলনার বিপুল সমাবেশ গ্রামীণ মেলাকে বর্ণাঢ্য করে তোলে। এর পাশাপাশি থাকে খাজা, গজা, মওয়া এসব খাদ্য সামগ্রীর সমাবেশ। থাকে নাগরদোলা, পুতুলনাচ, গাজির গান, সার্কাস, লাঠিখেলাসহ হরেক রকমের আয়োজন।
এ বছরই প্রথম করোনা আতঙ্কে ‘না’ বলতে হয়েছে বাঙালির প্রাণের এই উৎসবকে। তবু ঘরে বসেই মানুষ পুরনো দিনের রীতি অনুসরণ করে মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) পহেলা বৈশাখ বরণ করছেন বাংলা নববর্ষকে, প্রার্থনা করছেন যেন নতুন বছর সবার জীবনে বয়ে আসে সুখের বার্তা।

ব্রেকিং নিউজঃ