করোনায় টাঙ্গাইলে সরকারি হিসেবে ১২৪২ শিক্ষার্থী বাল্যবিয়ের শিকার

190

হাসান সিকদার ॥
লতা, রানী, সুর্বণাসহ অন্যান্য বান্ধবীরা স্কুল মাঠে বসে গল্প করছে। আর এদের গল্পে থাকার কথা প্রিয় বান্ধবী আশার। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে দীর্ঘ দেড় বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার মধ্যেই দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আশা বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। এজন্য তাদের বান্ধবী আশা এখন আর স্কুলে আসে না। সেজন্য স্কুলের বান্ধবীদের সকলেরই মন খারাপ। স্কুলে তাদের কোন কিছুই যেন ঠিকমতো চলছে না। এমন চিত্র এখন জেলার অনেক স্কুলের। করোনা ভাইরাসের কারণে দীর্ঘ দেড় বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় সরকারি হিসেবে টাঙ্গাইল জেলার বিদ্যালয়গুলোর ১২শ’ ৪২ শিক্ষার্থী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২ ছেলে শিক্ষার্থীও রয়েছে। তবে বেসরকারিভাবে এ হিসাব ৫ হাজারের উপরে হবে। অভাব-অনটনসহ নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে স্বজনরা তাদের বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। গ্রামগুলোতে গোপনীয়তার সঙ্গেই এ বাল্য বিয়ে দেওয়া হয়েছে। জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে কালিহাতী উপজেলায় সবার্ধিক ২২৯ জন বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে।
টাঙ্গাইল জেলা শিক্ষা অফিস সূত্র জানা যায়, জেলার কালিহাতী উপজেলায় ২২৯, দেলদুয়ার উপজেলায় ২২৮, ধনবাড়ী উপজেলায় ১৫৩, সখীপুর উপজেলায় ১৪৩ জনের মধ্যে ২ ছেলে শিক্ষার্থী রয়েছে। এছাড়া মধুপুর উপজেলায় ১১৮, নাগরপুর উপজেলায় ১১৪, টাঙ্গাইল সদর উপজেলায় ৮৮, গোপালপুর উপজেলায় ৫৬, ঘাটাইল উপজেলায় ৪৯, বাসাইল উপজেলায় ৪৪, ভূঞাপুর উপজেলায় ১৪ এবং মির্জাপুর উপজেলায় ৬ জন শিক্ষার্থী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে।
এমনই অবস্থা টাঙ্গাইল সদর উপজেলার হুগড়া হাবিব কাদের উচ্চ বিদ্যালয়ের। এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৫৫৬ জন। এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে ফরম পূরণ করে ৩৫৯ জন। সরকারি ঘোষণার পর বিদ্যালয় খুললেও দুই শতাধিক শিক্ষার্থী স্কুলে উপস্থিত হয়। বাকিরা অনুপস্থিত থাকে। ক্লাস ও বোর্ডে অ্যাসাইমেন্ট নম্বর পাঠানোর কারণে ছাত্রীদের বিয়ের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাল্যবিয়ের শিকার ছাত্রীদের পরিবার বিভিন্ন এলাকার কাজী দিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করেছেন। অনেকে আবার রেজিস্ট্রি ছাড়াই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। নদীভাঙন কবলিত গ্রামের অধিকাংশ পরিবার খুবই দরিদ্র। কৃষিকাজ করে সংসার চালায়। এ কাজ করে মেয়ের লেখাপড়া চালানো খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে। করোনাকালীন সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকার কারণে অশিক্ষিত অভিভাবকরা তাদের ছেলে-মেয়েদের বাল্যবিয়ে দিয়ে দিয়েছে।
স্থানীয় যুবক খালেদ মিয়া টিনিউজকে বলেন, আমাদের গ্রামের মানুষ মধ্যবৃত্ত পরিবার তারা প্রত্যেকে অভাবগ্রস্থ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ঝড়ে পরে গেছে। বাল্যবিবাহ কারণে আমাদের স্কুলের ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে। যার কারণে শিক্ষার্থী অনেক কম। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে যারা ভাবছে স্কুল কবে খুলবে না খুলবে আমার সন্তান তো বড় যাচ্ছে তাই তাদের সন্তানদের বিয়ে দিয়ে দিছে। কলেজ পড়–য়া ছাত্র তানভীর হাসান টিনিউজকে বলেন, আমাদের এলাকার শুধু মেয়েরা নয় ছেলেরাও বিয়ে করে ফেলছে। তার প্রধান কারণ হচ্ছে দায়িদ্রতা, অসচেতনতার জন্য। দীর্ঘদিন স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকার জন্য অনেকে লেখাপড়া ছেড়ে কর্মস্থলে চলে গেছে এমনকি ২১ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে করে ফেলছে। যার কারণে শিক্ষার্থীরা ঝড়ে যাচ্ছে। আমাদের গ্রামের মানুষ মূখ্য অসচেতনতা তারা মনে করে যে মেয়েদের বিয়ে দিতে পারলেই মনে করে যে আমরা রক্ষা পেলাম। এখন সরকারের কাছে আমাদের আবেদন বাল্যবিবাহ বন্ধ করার জন্য। এসএসসি পরীক্ষার্থী বিলকিস আক্তার টিনিউজকে বলেন, করোনার কারণে আমাদের স্কুল দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে আমাদের অনেক বান্ধবীর বিয়ে হয়ে গেছে। স্কুলে আগের চেয়ে অনেক ছাত্রী কমে গেছে। তার কারণ হচ্ছে বাল্যবিবাহ।
আমেনা আক্তার টিনিউজকে বলেন, করোনার কারণে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকার কারণে আমাদের বান্ধবী, স্যার ম্যাডামদের সাথে তেমন যোগাযোগ ছিল না। এখন স্কুল খুলে দেওয়ার পর দেখি আমাদের অনেক বান্ধবী নেই। পরে শুনি তারা বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে। গ্রামে বাবা-মাদের তেমন সচেতনতা নেই। যার কারণে আমাদের বাল্যবিবাহের শিকার হতে হয়। আমাদের এখন একটাই চাওয়া সরকারের কাছে যাতে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করে থাকে। জান্নাত খাতুন টিনিউজকে বলেন, আমাদের চর এলাকার মানুষ শিক্ষিত না, যার কারণে বাবা-মা সচেতন না। যার কারণে বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। করোনার কারণে স্কুল অনেক দিন বন্ধ ছিল। বাবা-মারা ভাবছে যে স্কুল এতোদিন বন্ধ, কবে খুলবে তারা তা জানে না। সে কারণে অনেক বান্ধবীর বিয়ে হয়ে গেছে। এ কারণে তারা স্কুলে আসতে পারছে না। বাল্যবিবাহ ঠেকাতে হলে বাবা-মাসহ আমাদের সচেতন হতে হবে। উম্মে ফাতেমা আক্তার টিনিউজকে বলেন, করোনার কারেণ বাবা-মা সচেতন ছিল না। তারা মনে করেছে স্কুল কবে খুলবে না খুলবে। সে কারণে আমাদের অনেক বন্ধু-বান্ধবীর বিয়ে হয়ে গেছে। বাল্যবিবাহের কারণে অকেনে ভেঙে পরে। বিয়ে হওয়ার পরে তারা আর পড়ালেখা করতে পারে না। অনেক ভালো ছাত্রীদের বাল্যবিবাহের শিকার হতে হয়। তাদের বাবা-মা শ্বশুর-শ্বশুরি স্কুলে আসতে দেয় না। বলা যায় যে বাল্য বিবাহের কারণে স্কুল ও আমাদের দেশটাই ক্ষতির মধ্যে পরছে।
সহকারী শিক্ষক রেজাউল করিম টিনিউজকে বলেন, সরকার আমাদের স্কুল খোলার অনুমতি দিছে। তখন আমার স্কুলে এসে ছাত্রীদের উপস্থিত সংখ্যা কম দেখি। তারপর আমরা জানতে পারি যে আমাদের স্কুলের কিছু ছাত্রী বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে। কিছু কিছু অবিভাবক আছে যারা লেখাপড়া জানে না, তাদের আর্থিক সচ্ছলতা নাই। তারা ভাবে মেয়ে যত বড় হবে বিয়ে দিতে ততো টাকা লাগবে। এর জন্যই তারা তাদের ছেলে মেয়েদের অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে দেয়। স্কুলের সহকারী শিক্ষক ইদ্রিস মিয়া টিনিউজকে বলেন, এই করোনাকালীন সময়ে বাল্য বিবাহের পরিমান বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে গ্রাম অঞ্চলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে অবিভাবকরা তাদের মেয়েদের বিবাহ দেয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। করোনার কারণে স্কুল কলেজ বন্ধ থাকায় আমরা অবিভাবকদের সাথে যোগাযোগ করতে পারি নাই। এরজন্যই বেশি সংখ্যক মেয়ে বাল্য বিবাহের শিকার হয়েছে। সহকারী শিক্ষিকা মাহামুদা খাতুন টিনিউজকে বলেন, আমাদের স্কুলে বেশ কিছু ছাত্রীর বিয়ে হয়ে গেছে করোনাকালীন সময়ে। এ সময় আমরা অবিভাবকদের সাথে যোগাযোগ করতে পারি নাই। তাই সে সময় কিছু মেয়েদের বাল্য বিয়ে হয়ে গেছে। স্কুল খোলার পরে এখন আমারা ছাত্র-ছাত্রীদের এ বিষয়ে বুঝিয়ে বাল্য বিবাহ বন্ধের ব্যবস্থা করছি। এই এলাকা অশিক্ষিত নদী ভাঙন এলাকা তারা মনে করে যে তাদের সন্তান তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে পারলে একটু ঝামেলা দূর হলো। যেহেতু অশিক্ষিত শিক্ষার মর্যাদা বুঝে না। করোনাকালীন সময়ে যদি স্কুল খোলা থাকতো তাহলে এই দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বন্ধ থাকতো না। তাদের সাথে আলোচনা করতে পারতাম তাদের বুঝাতে পারতাম। যদি আমরা শুনতাম আমাদের স্কুলের ছাত্রীরা বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে তাহলে আমরা প্রতিরোধ করতে পারতাম। এখন যেহেতু স্কুল খোলা অভিভাবকদের সাথে আমরা কাউন্সিল করতে পারবো। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করতে পারবো।
হাবিব কাদের উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামীম আল মামুন জুয়েল টিনিউজকে বলেন, করোনাকালীন সময় দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকার কারণে। নিয়মিত ক্লাস না হওয়ার কারণে অভিভাবকদের সাথে দীর্ঘ সময় যোগাযোগ না হওয়ার কারণে কিছু মেয়েদের বাল্যবিবাহ হয়ে গেছে। কিছু ছেলে মেয়ে ঝড়ে গেছে। করোনার আগে আমাদের বিদ্যালয়ে কার্যক্রম স্বাভিক ছিল তখন আমরা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটি মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি। আামদের বিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েসহ অভিভাবকদের সচেতন করি বাল্যবিবাহ রোধ করার চেষ্টা করি। দীর্ঘ দেড় বছর বিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারণে ছাত্র-ছাত্রীসহ অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ করতে পারি নাই। সে কারণে কিছু মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে। আমরা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটি আবার মিটিং করেছি এবং অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ করতেছি। যাতে করে এই বাল্যবিবাহের শিকার আর না হয়। অভিভাবকসহ এলাকার লোকজনের সচেতন হতে হবে। ইতিমধ্যে যারা ঝড়ে পরেছে তাদের সাথে যোগাযোগ করে বিদ্যালয়ের দিকে আনার চেষ্টা করবো।
টাঙ্গাইল জেলা শিক্ষা অফিসার লায়লা খানম টিনিউজকে বলেন, করোনার কারণে দীর্ঘ দেড় বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। গত ১২ সেপ্টেম্বর সারাদেশের ন্যায় টাঙ্গাইলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলেছে। প্রতিষ্ঠানে ৮৮ শতাংশ শিক্ষার্থী উপস্থিত আছে। উপস্থিতি দিনদিন বাড়ছে। আমরা কিছু বাল্যবিবাহের ঘটনা শুনতে পাচ্ছি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। আমরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে খোঁজও নিয়েছি। আগে প্রায় বাল্যবিবাহ ছিল না। এখন যে বাল্যবিবাহের সংখ্যা হয়েছে। আশা করছি এদেরকে আমরা কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনতে। আগে বাল্যবিবাহ ছিলোই না বলা চলে। সেরকম যাতে বাল্যবিবাহের শিকার না হয়। আমরা সেটা চেষ্টা করছি।

 

 

 

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ