করোনায় এলোমেলো শিশুদের স্বাভাবিক জীবন

5

এম কবির ॥
সাড়ে চার বছরের শিশু মুনিয়া। কোভিড শুরুর আগে সপ্তাহে অন্তত তিনদিন বাবার সঙ্গে বাইরে যাওয়া ছিল তার নিয়মিত রুটিন। বাসার পাশে খেলার মাঠ। সেখানে বল নিয়ে খেলা। রিক্সা করে ঘুরে বেড়ানো…। মাঝেমধ্যে হাত ধরে গুঁটি গুঁটি পায়ে বাজারে মাছও দেখতে যেত। প্রায় আট মাস। ছোট্ট এই শিশুদের স্বাভাবিক জীবনযাপন যেন থমকে গেছে। সংক্রমণের ভয়ে পরিবারের কেউ তাকে নিয়ে বাইরে যান না। অভাব-অনটনের সংসার। তাই সাড়ে ৫০০ বর্গফুটের ছোট্ট দুই রুমের বাসায় তার ২৪ ঘণ্টা কাটে। ইচ্ছা হলে গাড়ি বা মোবাইল নিয়ে খেলে…। নয়ত চুপ করে বসে থাকে মুনিয়া। আগের চঞ্চলতা অনেকটাই নেই। তবে বাইরে যাওয়ার নেশা কাটেনি। চার তলার বারান্দার গ্রিল ধরে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে অনেক সময়। ইচ্ছার বিরুদ্ধে টেনে নিয়ে গেলে চিৎকার করে…। কান্না যেন থামেই না…।
কয়েক মাসের মাথায় শিশুটির স্বাভাবিক আচরণে যে পরিবর্তন এসেছে বাবা-মা তা বুঝতে পেরেছেন। তবে শিশুটিকে স্বাভাবিক রাখতে পরিবারের পক্ষ থেকে চেষ্টার কোন কমতি নেই, বলছেন বাবা হামিদুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা এখন সন্তান ও তার ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত। ভাবছি একজন শিশু বিশেষজ্ঞ দ্রুত দেখাব। করোনায় ১১ বছরের শিশু রোদেলা ২৪ ঘণ্টা কাটে আরেকটু অন্যরকমভাবে। দিনরাত মেজাজ করে এক সময়ের চুপচাপ থাকা মেয়েটি। খাওয়া-দাওয়া, গোসল ও ঘুমের রুটিন বদলে গেছে। স্কুলের পড়ায় মন নেই। মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ততা। বাবা বাসায় ফেরার পর ল্যাপটপে গেম দেখা। ছোট বোনটিকেও কোলে নিতে পর্যন্ত চায় না। শহরের সৃষ্টি স্কুলের এই ছাত্রীর বাবা রিপন জানালেন, আমরা সব সময় রোদেলাকে সময় দেয়ার চেষ্টা করি। গান, নাচ ও আর্ট স্কুলও বন্ধের কারণে মেয়েটি আরও বেশি সমস্যায় পড়েছে। চেষ্টা করেও তাকে আর গানে বসানো যাচ্ছে না। আর্ট ক্লাস একেবারেই ভুলে গেছে। হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করলেও সে নিজের মতো করে আলাদা সময় কাটাতে পছন্দ করে। করোনা আসলে বাচ্চাদের জীবনটা এলোমেলো করে দিয়েছে। আমরা বাচ্চাদের নিয়ে চিন্তায় আছি।
গত (৮ মার্চ) দেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হলে জনসমাগম এড়াতে (১৭ মার্চ) থেকে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে সরকার। পর্যায়ক্রমে মেয়াদ বাড়িয়ে (৩১ অক্টোবর) পর্যন্ত করা হয়েছে। শীত মৌসুমে করোনার সংক্রমণ বাড়তে পারে। এমন আশঙ্কা থেকে সামনের দিনগুলো আরও বিপজ্জনক। তাই ধারণা করা হচ্ছে, এ বছর আর খুলছে না শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এতে শিশুদো মনোজগতেও পড়ছে বিরূপ প্রভাব। এর বাইরেও রয়েছে শিশুদের একটি বিরাট অংশ। সব মিলিয়ে শিশুরা এখন ভাল নেই। বিশেষ করে শহুরে শিশুদের জন্য দিনগুলো সবচেয়ে কঠিন কাটছে। গৃহবন্দী জীবন কাটাতে হচ্ছে তাদের। বন্দী শিশুদের মনে যেন ভয় ঘিরে ধরতে না পারে সেদিকেই বেশি নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন মনোবিজ্ঞানী ও চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, ব্যস্ততার কারণে অন্য সময় অভিভাবকরা শিশুদের তেমন একটা সময় দিতে পারেন না। বরং এই সময়টাকে নষ্ট না করে অভিভাবকরা পরিকল্পনামাফিক প্রতিটি মুহূর্তকে আনন্দঘন করে তুলতে পারেন। অর্থাৎ শিশুদের হাশিখুশি রাখতে পারলে তারা ভাল থাকবে। তাদের মনে কোন বিরূপ প্রভাব পড়বে না।
এদিকে করোনা সঙ্কটে শিশুর মনোজগতে যেন নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার না করতে পারে সে জন্য বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটির মতে, সস্তানকে শরীর চর্চা করাতে পারেন। সন্তানের সঙ্গে খেলায় সঙ্গ দিন। ওদের সঙ্গে খেলতে খেলতে বাড়ির বড়দেরও খানিকটা শরীর চর্চা হয়ে যাবে। পড়াশোনার বাইরে অবসর সময় কাটানোর জন্য সন্তানের হাতে মোবাইল ফোনের পরিবর্তে তুলে দিন গল্পের বই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু টিভি, মোবাইল বা কম্পিউটারের সঙ্গে যতটা কম সময় কাটাবে, ততই ভাল। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা দিনে বড়জোড় এক ঘণ্টা টিভি বা কম্পিউটারে সময় কাটাতে পারে। বাস্তবে শিশুরা কেমন আছে।
তা দেখতে টাঙ্গাইল শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিভাবকরা শিশুদের নিয়ে এসেছেন এসপি পার্ক ও ডিসি লেকে। অভিভাবকরা টিনিউজকে জানান, আমাদের ছেলেমেয়েরা ভাল নেই। ঘরে বন্দী থাকতে থাকতে দিন দিন কেমন হয়ে যাচ্ছে। তাই ঝুঁকি থাকলেও এসেছি। ঘরে থাকলেও মৃত্যু, বের হলেও মৃত্যু! তবুও বাঁচার চেষ্টা করে দেখি। যদি পারি। চোখে-মুখে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে এসব কথা বলছিলেন কলেজপাড়া থেকে আসা তানিয়া রহমান। তিনি টিনিউজকে বলেন, চাকরির প্রয়োজনে স্বামী টাঙ্গাইলের বাইরে থাকেন। মাঝে মাঝে আসেন। কিন্তু আমার মেয়ের তো দিন যাচ্ছে না। তাই বের হওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই।
এর কারণ হিসেবে পুরো বিশ্ব একটি সাইকোলজিক্যাল প্যানডেমিকের দিকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন মনোবিজ্ঞানীরা। তারা বলেন, শিশু-কিশোরদের ওপরও মানসিক চাপ পড়ছে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় অভিভাবকদের কিশোর-কিশোরী সন্তানের মনের কষ্ট বুঝতে হবে। আর শিশুদের ব্যস্ত রাখতে হবে বিভিন্নভাবে। সর্বোপরি মা-বাবার মানসিক স্বাস্থ্যও ভাল রাখতে হবে এবং দাম্পত্য সম্পর্ক ভাল রাখতে হবে। তা না হলে কোন কথাই কাজে আসবে না। অনলাইন ক্লাসগুলোর বিস্তার বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে স্কুলের পোশাক পরে এসব ক্লাসে শিশুদের অংশ নেয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। শিশুদের জন্য স্কুলে যাওয়া সব সময়ই আনন্দের বিষয়। তারা স্কুলে যাবে, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করবে, মাঠে খেলবে, শিক্ষক-শিক্ষিকার আদর পাবে। কিন্তু দীর্ঘ সময় স্কুলে না যেতে পেরে তারা হতাশ ও বিরক্ত। হতাশা থেকে রাগ হয়, অল্পতে ক্ষেপে যায়, পড়তে চায় না, মায়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে- এসব সমস্যা এখন ঘরে ঘরে। তিনি বলেন, এই করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কিন্তু ক্ষণস্থায়ী নয়। এটি দীর্ঘকাল থাকবে। তাই সঙ্কট মোকাবেলার জন্য আমাদের উপায় বের করতে হবে।

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ