ইউপি নির্বাচনে ধনবাড়ীতে বিদ্রোহীরাই এখন আওয়ামী লীগের গলার কাঁটা

232

স্টাফ রিপোর্টার ॥
দ্বিতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে বিএনপি’র কোন প্রার্থী আনুষ্ঠানিকভাবে অংশ না নেয়ায় আওয়ামী লীগের মনোনীত (নৌকা) প্রার্থীদের গলার কাঁটা এখন বিদ্রোহীরা। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দলে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পাওয়ায় বিদ্রোহী প্রার্থী (স্বতন্ত্র) হয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। বিদ্রোহীরা কোমর বেঁধে নির্বাচনী প্রচারণায় নামায় দুশ্চিন্তায় আওয়ামী লীগের দলীয় নেতাকর্মীরা। তাঁরা দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী করতে এখন মরিয়া। লাঠি-সোটা নিয়েও মিছিল করতেও দেখা গেছে দলীয় প্রার্থীর সমর্থকদের। সুযোগ পেলেই বিদ্রোহীদের নির্বাচনী অফিস ভাংচুর, ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে নির্বাচনী পোষ্টার, হচ্ছে কর্মীদের উপর হামলা। দেখাচ্ছে ভয়ভীতি। প্রতিকার চেয়ে বিদ্রোহীরা বিভিন্ন দপ্তরে দিচ্ছে অভিযোগ। তবুও থেমে নেই বিদ্রোহীরা। বিচার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরাই এগিয়ে। তবে, সাধারণ ভোটাররা বলছেন, একটি দল দীর্ঘদিন ক্ষমতা থাকা ও মাঠ পর্যায়ের নির্বাচনে নৌকা প্রতিক থাকায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচন কমিশন বলছে, যদি কোন প্রার্থী তাঁর প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচার-প্রাচারণায় বাঁধাগ্রস্ত করে তাহলে সেই প্রার্থীর বিরুদ্ধে নেয়া হবে ব্যবস্থা। আগামী (১১ নভেম্বর) টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার ৭ ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
ধনবাড়ীর সাত ইউনিয়নে নির্বাচনের মধ্যে এরই মধ্যে বিনা ভোটে জয়ী হয়েছেন তিনজন চেয়ারম্যান প্রার্থী। এলাকাবাসী বলছে, ওই তিন ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরা দলীয় চাপে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছেন। বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় যারা জয়ী হয়েছেন তারা হলেন-মুশুদ্দি ইউনিয়নে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক এমপির ভাই আবু কায়সার, বলিভদ্র ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম তালুকদার ও বীরতারা ইউনিয়নে আহমেদ আল-ফরিদ।
আর বাকি চার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন ১৮জন প্রার্থী। তাঁর মধ্যে পাইস্কা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন- আব্দুল মান্নান (নৌকা), এখানে বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী হিসাবে রয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম বাবুল (ঘোড়া), আর্শেদ আলী রাসু (চশমা), শফিকুল ইসলাম (মোটরসাইকেল), রইস উদ্দিন রাঙ্গা (আনারস) ও বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী আব্দুল জলিল (হাতপাখা)।
যদুনাথপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের ভাই বর্তমান চেয়ারম্যান মীর ফিরোজ আহমেদ (নৌকা), এখানে বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী হিসাবে রয়েছেন কামরুজ্জমান টিটু (টেবিলফ্যান), খলিলুর রহমান (মোটরসাইকেল), রকিবুল হাসান তরফদার (আনারস), আমজাদ হোসেন (চশমা) ও আব্দুল আজিজ (ঘোড়া)।
ধোপাখালী ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান চেয়ারম্যান আকবর হোসেন (নৌকা)। তাঁর সাথে প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন (স্বতন্ত্র) খোরশেদ আলম (ঘোড়া) ও উপজেলা বিএনপির সদস্য কামাল হোসেন তালুকদার মিন্টু (আনারস)।
বানিয়াজান ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম তালুকদার ফটিক (নৌকা), এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ আলম তালুকদার (আনারস) ও খোকন মিয়া (ঘোড়া)।
এই চার ইউনিয়নের মধ্যে ধোপাখালী ইউনিয়ন ব্যতিত পাইস্কা, যদুনাথপুর ও বানিয়াজানে হচ্ছে প্রতিদিনই অপ্রতিকর ঘটনা। যে কোন সময় ঘটতে পারে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এমনটাই মনে করছেন ইউনিয়নবাসী। বিদ্রোহী প্রার্থী ও তার সমর্থকরা টিনিউজকে জানান, যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয় তাহলে বিপুল ভোটে স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই বিজয়ী হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সু-দৃষ্টি কামনা করেন তাঁরা।
নির্বাচন বিষয়ে ইউপি নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক এমপি দলীয় ইউপি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র উঠানোর আগে তিনি তাঁর নিজ উপজেলা ধনবাড়ীর দলীয় কার্যালয়ে দলের তৃণমূলের নেতাকর্র্মীদের সাথে মতবিনিময় করেন। মতবিনিময়কালে কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যদি কোন নেতাকর্মী নির্বাচনে অংশ নেয় তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এদিকে ওই চার ইউনিয়নে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে অনেকেই বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে ও ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নির্বাচনী যে হাওয়া বইছে এতে বর্তমানে কিছুটা নির্বাচনী আমেজ বিরাজ করছে। এলাকায় বিভিন্ন আড্ডাস্থল ও চায়ের দোকান, হাঁট-বাজারগুলোতে চলছে নির্বাচনী আলোচনা। এছাড়াও বিভিন্ন প্রার্থীরা তার প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থী ও তাঁর দলীয় কর্মীদের উপর হামলা চালাচ্ছেন ও নির্বাচনী পোষ্টার ছিঁড়ে ফেলছেন। এতে ভোটাররা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। প্রতিকার চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীরা নির্বাচন অফিস ও বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছেন।
এদিকে, প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার পরপরই প্রার্থীরা পোষ্টার, ফেস্টুন, ব্যানার ও লিফলেট বিভিন্ন মোড়ে-মোড়ে ও হাঁট-বাজারে লাগাচ্ছে। জনপ্রিয় বিভিন্ন গানের সুরে নির্বাচনী গান মাইকে অতি শব্দে প্রচার করে শব্দ দূষণ করছে। প্রতিনিয়ত চলছে মোটরসাইকেল শো-ডাউন, মিটিং মিছিল যা সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়। ৭ ইউনিয়নে ইউপি সদস্য পদে নির্বাচন করছে পুরুষ ১৮৫ জন এবং সংরক্ষিত মহিলা ৬৫ জন। এঁদের মধ্যে অনেক প্রার্থীও আবার দেখাচ্ছেন দলীয় ক্ষমতার জোড়। সব মিলিয়েই আসন্ন ইউপি নির্বাচনে হ-য-ব-র-ল অবস্থা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা টিনিউজকে বলেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা দলীয় পদ-পদবীর চেয়ে তাঁরা চেয়ারম্যানের পদকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। যাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো তারাই এ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীরা টিনিউজকে আরও জানান, দীর্ঘদিনে পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের যাচাই-বাচাই করেই আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিয়েছে।
এ ব্যাপারে পাইস্কা ইউনিয়নে ভোটার আব্দুর রহমান ও সোলাইমান কবির টিনিউজকে জানান, আমরা ভোট দিতে পারবো কিনা সন্দেহ রয়েছে। ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার আগে আমাদের ভোট দেয়া হয়ে যায়। তখন খুবই খারাপ লাগে। ধোপাখালী ইউনিয়নের তরুণ ভোটার আল-আমিন ও জামাল শেখ টিনিউজকে বলেন, আমরা যোগ্য প্রার্থীকেই ভোট দিবো। তাঁরা যেন নির্বাচিত হয় ইউনিয়নের উন্নয়ন তথা জনগণের সেবা করতে পারে।
অপ্রীতিকর ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে পাইস্কা ইউনিয়েনে আওয়ামী লীগের মনোনীত (নৌকা) প্রার্থী আব্দুল মান্নান টিনিউজকে জানান, আমার কোন দলীয় নেতাকর্মী কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটায়নি। তারা মিথ্যা প্রচার করছে। যদুনাথপুরের আওয়ামী লীগের মনোনীত (নৌকা) প্রার্থী মীর ফিরোজ আহমেদ টিনিউজকে জানান, আমার বিরুদ্ধে অনেকেই মিথ্যা, বানোয়াট সংবাদ প্রচার করছে। এর চেয়ে তিনি আর কিছু বলতে রাজি হননি। বানিয়াজানের আওয়ামী লীগের মনোনীত (নৌকা) প্রার্থী রফিকুল ইসলাম তালুকদার ফটিকের সাথে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি।
ধনবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হারুনার রশীদ হীরা টিনিউজকে বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থীরা দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না। নির্বাচনে সহিংসতা, হুমকি-ধামকি সারা বিশ্বে¦ই আছে। এটা নির্বাচনেরই একটি অংশ। সুষ্ঠু নির্বাচনে সরকার ও নির্বাচন কমিশন যে পদক্ষপগুলো নিয়েছে আমরা সে ব্যাপারে সহযোগিতা করবো।
ধনবাড়ী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা করুনা সিন্দু চাকলাদার টিনিউজকে বলেন, যে সকল প্রার্থী সহিংসতার বিষয়ে আমাদের নিকট অভিযোগ দিয়েছে এগুলো আমরা থানার ইনচার্জকে ঘটনার সত্যতা যাচাই-বাচাই করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলেছি। অভিযোগের বিষয়ে হচ্ছে তদন্ত। জনগণকে সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে কাজ করে যাচ্ছি। নির্বাচন কমিশন থেকে আমাদের কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছে কোন প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থীর উপর অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। ভোটাররা কেন্দ্রে নির্ভয়ে ভোট দিতে আসবে। এজন্য সব সময় মাঠে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কাজ করবে।
নির্বাচনী অভিযোগের বিষয়ে ধনবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) চান মিয়া টিনিউজকে জানান, বিভিন্ন প্রার্থী ছোট-ছোট অভিযোগ দিয়েছে। এগুলো তদন্ত করা হচ্ছে এবং ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত উপজেলায় কোন বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আমাদের পক্ষ থেকে সকল প্রস্ততি সম্পন্ন করা হয়েছে।

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ