আটটি পৌরসভা নির্বাচনে শান্তিপুর্নভাবে ভোট গ্রহন শেষ

144

imagesফাহাদ শাওনঃ

দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া টাঙ্গাইলের আটটি পৌরসভা নির্বাচনে শান্তিপুর্নভাবে ভোট গ্রহন শেষ হয়েছে। প্রসাশনের নিরপেক্ষ ভূমিকায় ভোটারদের মধ্যে ছিল বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা। তারা শর্তফুর্তভাবে কেন্দ্রে গিয়ে নিঘেœ তাদেও ভোটাধীকার প্রয়োগ করেছেন। ভোটাদের কোন অভিযোগ ছিল না। তারা অতীতের অনেক নির্বাচনের কথা উল্লেখ করে বলেন, এবারের ভোটে ভীষন খুশি। দলীয় পরিচয়ে মেয়র পদে এবারই প্রথম নির্বাচন। এ কারণে উৎসাহের বিষয়টি ছিল আরও প্রবল। যার যার দল নিয়ে তারা প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এমন নির্বাচনই ভোটাররা আশা করেছিলেন। দুই বিএনপি প্রার্থী ও এক ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী সকাল ১১ টার দিকে নির্বাচন বর্জন করেছেন। বাকি প্রার্থীরা নির্বাচনের প্রতিদ্বন্ধিতায় ছিলেন।
সকাল ৮টা থেকে শুরু হওয়া ভোট গ্রহন একটানা বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলেছে। সকাল থেকেই উৎসবমুখর পরিবেশে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোটারদের ভোট দিতে দেখা যাচ্ছে। শীতের কারনে সকালের দিকে কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটার উপস্থিতি বাড়তে থাকে। পুরুষের চেয়ে মহিলা ভোটারের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
জেলার ১১টি পৌরসভার মধ্যে আজ বুধবার ৮টি পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। পৌরসভাগুলো হলো- টাঙ্গাইল সদর, ধনবাড়ি, মধুপুর, গোপালপুর, ভুঞাপুর, কালিহাতী, মির্জাপুর ও সখীপুর। জেলা নির্বাচন অফিস সুত্রে জানা গেছে, ৮টি পৌরসভার ১২১টি কেন্দ্রের ৮৩৫টি কক্ষে  মোট ২ লাখ ৯২ হাজার ২৫৩ জন ভোটার তাদের ভোটারাধিকার প্রয়োগ করছেন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার রয়েছেন ১ লাখ ৪৩ হাজার ৭৩০জন এবং মহিলা ভোটার রয়েছেন ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫২৩ জন। বাকি তিন পৌরসভা নতুন হওয়ার কারণে ওই তিন পৌরসভায় ভোট হয়নি। ৮টি পৌরসভায় মেয়র পদে ২৯ জন, কাউন্সিলর পদে  ৩০৪ জন এবং সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে ১০৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দিতা করছেন।
নির্বাচন সুষ্ঠ ও শান্তিপুর্নভাবে সম্পন্ন করার জন্য নির্বাচনী এলাকায় চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ভোট কেন্দ্র ও নির্বাচনী এলাকার পরিবেশ শান্তিপুর্ন রাখতে বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব ও আনসার দায়িত্ব পালন করছেন। আটটি পৌর এলাকায় ৩৭ জন জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন।
টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মাহবুব হোসেন বলেন, টাঙ্গাইলের মানুষ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে তাদেও ভোটার অধিকার প্রয়োগ করেছেন। ৮ টি পৌরসভায় সচেতন নাগরিকরা কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটায়নি। প্রসাশনের পক্ষ থেকে যথেষ্ট নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। ভোটাররা এটাকে সাধুবাদ জানিয়েছে। ভ্রাম্যমান আদালত কাজ করেছে ভোট কেন্দ্র গুলোতে।
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আইন শৃঙ্খলা বাহিনী পক্ষ থেকে কোন প্রকার দায়িত্ব অবহেলা হয়নি। তাই কোন কেন্দ্রেই কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ভোটারও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিয়েছেন। নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করাটাই ছিল আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আমরা তা করতে পেরেছি। আশা করি নির্বাচনের ফলাফল ঘোষনার পরেও পরিবেশ শান্তিু পূর্ণই থাকবে।
এদিকে, প্রকাশে ভোট প্রদানে বাধ্যকরন, এজেন্টদের বের করে দেয়া, কেন্দ্র দখল এবং দলীয় সমর্থকদের মারধর করার অভিযোগ এনে নির্বচন বর্জনের ঘোষনা করেছেন টাঙ্গাইলের মধুপুর পৌরসভার নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী শহীদুল ইসলাম (সরকার শহীদ)। তিনি সকাল সাড়ে ১১টার সময় উপজেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি এ ঘোষনা দেন। এ সময় তিনি সংবাদিকদের অভিযোগ করে বলেন, সকাল ৮টার দিকে ভোটারা উপস্থিত হলেও সরকার দলীয় প্রার্থীর সমর্থকরা প্রকাশে ভোট দিতে বাধ্য করে। এর পর এজেন্টদের ভোট কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে জাল ভোট প্রদান করে। মধুপুর পৌরসভার সকল ভোট কেন্দ্র একই চিত্র হওয়ায় তিনি নির্বাচন বর্জন করেন বলে জানান তিনি। মধুপুরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীর পাখা প্রতীকের একটি নির্বাচনী ক্যাম্পে সংবাদ সম্মেলন করে একই অভিযোগে দলীয় প্রার্থী  হারুন অর রশিদ(প্রতীক পাখা) নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।
মধুপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও রিটানিং কর্মকর্তা রমেন্দ্র নাথ বিশ্বাস ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মিসবাহ উদ্দীন জানান, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে ভোট গ্রহন চলছে। অইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষনিক ভোট কেন্দ্রে নজরদারি করছেন। দু’টি রাজনৈতিক দলের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কোন লিখিত কোন কাগজপত্র পাননি। তবে, লোকমুখে তারা এ ধরণের খবর শুনেছেন বলে জানান তিনি
অন্যদিকে, ভোটারদের ভয়-ভীতি ও এজেন্টদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়ার অভিযোগ এনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন টাঙ্গাইলের গোপালপুর পৌরসভায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থী খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম রবেল। বুধবার দুপুরে গোপালপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সংবাদ সম্মেলন করে করে তিনি এ ঘোষণা দেন।
জাহাঙ্গীর আলম রবেল অভিযোগ করেন, বিভিন্ন কেন্দ্রে আমার এজেন্টদের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। যারা আগে ঢুকেছিল তাদেরও বের করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি ভোটারদেরও ভয়ভীতি দেখাচ্ছে সরকার দলের লোকজন। তাই আমি এ প্রহসনের নির্বাচন থেকে বর্জন করলাম। গোপালপুর পৌরসভায় আওয়ামী লীগ থেকে নৌকা মার্কা নির্বাচন করছেন রফিকুল হক সানা। লড়ছেন আওয়ামী লীগের এক বিদ্রোহী প্রার্থী বেলায়েত হোসেন।
জেলা নির্বাচন অফিস সুত্র জানিযেছে, জেলার ৮টি পৌরসভায় মেয়র পদে ২৯ জন, কাউন্সিলর পদে ৩০৪ জন। সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে ১০৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
টাঙ্গাইল পৌরসভায় মেয়র পদে জামিলুর রহমান মিরন (আওয়ামী লীগ), মাহমুদুল হক সানু (বিএনপি), আবদুল কাদের (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ), হাসনাত আল আমিন (খেলাফত মজলিশ)। সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী ৭২ জন এবং সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী ৩২ জন।
ধনবাড়ি পৌরসভায় মেয়র প্রার্থী খন্দকার মঞ্জুরুল ইসলাম তপন (আওয়ামী লীগ), এএমএ ছোবহান (বিএনপি), অধ্যক্ষ ফেরদৌস আহমেদ পিন্টু (জাতীয়পার্টি-এ) ও জহিরুল হক হেলাল বকল (আওয়ামী লীগ-বিদ্রোহী)। সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী ২৯ জন এবং সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী ১০ জন।
গোপালপুর পৌরসভায় মেয়র প্রার্থী রকিবুল হক ছানা (আওয়ামী লীগ), খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম রুবেল (বিএনপি), আব্বাস আলী (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ), বেলায়েত হোসেন (আওয়ামী লীগ-বিদ্রোহী)। সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী ৩৮ জন এবং সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী ১২ জন।
ভুঞাপুর পৌরসভায় মেয়র প্রার্থী হলেন মাসুদুল হক মাসুদ (আওয়ামী লীগ), আজহারুল ইসলাম (আওয়ামী লীগ-বিদ্রোহী), আবদুল খালেক মন্ডল (বিএনপি)। সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী ৩২ জন ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী ৯ জন।
কালিহাতী পৌরসভায় মেয়র প্রার্থী আনছার আলী বিকম (আওয়ামী লীগ), হুমায়ুন খালিদ (আওয়ামী লীগ-বিদ্রোহী), আলী আকবর জব্বার (বিএনপি), শহীদুল ইসলাম (স্বতন্ত্র)। সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী ৩৩ জন এবং সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী ১৩ জন।
মির্জাপুর পৌরসভায় মেয়র প্রার্থী সাহাদৎ হোসেন সুমন (আওয়ামী লীগ), হযরত আলী (বিএনপি)। সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী ২৯জন এবং সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী ৯ জন।
সখীপুর পৌরসভায় মেয়র প্রার্থী আবু হানিফ আজাদ (আওয়ামী লীগ), নাছির উদ্দিন (বিএনপি), ছানোয়ার হোসেন সজীব (বিএনপি-বিদ্রোহী), আয়নাল হক সিকদার (জাতীয় পার্টি-এ)। সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী ৩১জন ও মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী ১০জন।
মধুপুর পৌরসভায় মেয়র পদে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মাসুদ পারভেজ (নৌকা), বিএনপি প্রার্থী সরকার শহীদুল ইসলাম (ধানের শীষ) এবং ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন (চরমুনাই পীরের) মনোনীত হারুন অর-রশিদ (হাত পাখা) প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী ৪০জন ও মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী ১২জন।
এদিকে, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর পৌরসভায় ভোট গ্রহনের এক ঘন্টার মধ্যে আওয়ামীলীগ ও আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে পৃথক সংঘর্ষে আ’লীগের বিদ্রোহী মেয়র প্রার্থী তারিকুল ইসলাম চঞ্চল, শ্রমিক নেতা খায়রুল ইসলাম তালুকদার বাবলু সহ ৫০ জনের বেশি কর্মী-সমর্থক আহত হয়েছেন। মুমুর্ষূ অবস্থায় মেয়র প্রার্থী তারিকুল ইসলাম চঞ্চল, শ্রমিক নেতা খায়রুল ইসলাম তালুকদার বাবলুকে প্রথমে ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাদেরকে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অন্যদের ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, পৌর আওয়ামীলীগের সভাপতি ও দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী তারিকুল ইসলাম চঞ্চল(প্রতীক মোবাইল) বুধবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ডের বাহাদীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে যাওয়ামাত্র আওয়ামীলীগ দলীয় প্রার্থী মাসুদুল হক মাসুদের কর্মী-সমর্থকরা দা-লাঠি নিয়ে তার উপর হামলা করে। ওই হামলায় তিনি দুই সহকর্মীসহ আহত হন।
অপরদিকে, প্রায় একই সময় আওয়ামীলীগের প্রার্থী মাসুদুল হক মাসুদের(প্রতীক নৌকা) সমর্থক ও উপজেলা শ্রমিকলীগের নেতা খায়রুল ইসলাম তালুকদার বাবলু পৌরসভার ঘাটান্দি কেন্দ্রে ভোট দিতে যাওয়ার পথে উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক ও দলের অপর বিদ্রোহী প্রার্থী আজহারুল ইসলামের(প্রতীক জগ) ২০-২৫জন কর্মী-সমর্থক হামলা চালায়।  হামলাকারীদের দা-লাঠি-হকিস্টিকের আঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন।
এদিকে, সকাল ১০ টার দিকে ভূঞাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের(নৌকা) সমর্থিত প্রার্থীর কর্মীদের সঙ্গে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে ভূঞাপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা সাহিনুল ইসলাম তরফদার বাদল সহ উভয় পক্ষের প্রায় ৩৫ নেতাকর্মী আহত হন। এছাড়া, পৌরসভার বামনহাটা, তেঘরি ও ছাব্বিশা কেন্দ্রে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষে ১০-১২ জন আহত হয়েছেন। সাহিনুল ইসলাম তরফদার বাদল সহ কয়েকজনকে ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। অন্যদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়।

ব্রেকিং নিউজঃ