অগ্রহায়নের রঙে সাজছে টাঙ্গাইলের প্রকৃতি

70

এম কবির ॥
ঋতু বৈচিত্র্যের দিক থেকে বরাবরই এগিয়ে বাংলাদেশ। প্রতি দুই মাস পর পর বদলে যাচ্ছে প্রকৃতি। দিন তারিখের খবর কেউ রাখেন। কেউ রাখেন না। তাতে কী? পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত আছে। প্রকৃতির এই পরিবর্তন উপভোগ করেন সবাই। বাংলাদেশে একেক ঋতুর একেক রং ও রূপ। স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। একই নিয়মে এসেছে অগ্রহায়ণ।
বাদ বাকি কথা বলার আগে মনে করিয়ে দেয়া জরুরী যে, এবার অগ্রহায়ণের শুরুটা বেশ গোলমেলে ছিল। বাংলা মাসের হিসাব নিকাষ কিছুটা পাল্টে যাওয়ায় অগ্রহায়নের জন্মদিন নিয়ে সংশয় সন্দেহ দেখা দেয়। পুরনো হিসেব অনুযায়ী অগ্রহায়ণ শুরু হয়ে গিয়েছিল গত (১৪ নভেম্বর)। তারপর সামনে আসে নতুন হিসাব। বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে জানানো হয় (১৫ নভেম্বর) হেমন্তের সূচনা হয়েছে। বাংলাদেশের বিশেষ বিশেষ দিবসগুলো প্রতিবছর একই দিনে পালনের চিন্তা থেকে ক্যালেন্ডারে এ পরিবর্তন করা হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম দিন থেকে নতুন হিসাব কার্যকর হলেও বিষয়টিকে সামনে এনেছে। প্রথমবারের মতো মাসটি ৩১ দিনে গড়ায়। সে অনুযায়ী শনিবার (২১ নভেম্বর) অগ্রহায়ণের ষষ্ঠ দিন।
অবশ্য এ পর্যায়ে এসে ক্যালেন্ডারের দিকে না তাকালেও চলে। প্রকৃতিই অগ্রহায়ণ আসার খবর প্রচার করে চলেছে। চারপাশটাকে ক্রমে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিচ্ছে প্রিয় ঋতু। পরিবর্তনের এ ছবিটা গ্রামেই বেশি স্পষ্ট হয়। টাঙ্গাইলে এরই মধ্যে চলে এসেছে অগ্রহায়ণের হাওয়া। টাঙ্গাইলে যারা ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন, উঠে অভ্যস্থ, তারা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন এখন পায়ের নিচের ঘাসগুলো আগের মতো শুকনো মচমচে নয়। ভিজে একাকার। ঘাসের ডগায় শিশিরবিন্দু জমে থাকে। কাঁচা রোদ এসে সেখানে পড়তেই আলোর ফুল ফুটে! মনে করিয়ে দেয় অগ্রহায়ণ এসেছে। সকাল বেলাটা শীত শীত অনুভূতির। বিকেলেও তা-ই। সন্ধ্যার পর হালকা শীতের আমেজ। গভীর রাতে স্ট্রিট লাইটের আলো কুয়াশাকে ফালি ফালি করে কাটছে। ভালভাবে খেয়াল করলে এই দৃশ্য চোখ এড়ায় না। তখন মনে পড়ে যায় জীবনানন্দ দাশের সেই পঙ্ক্তি পা-লিপি কাছে রেখে ধূসর দ্বীপের কাছে আমি/নিস্তব্ধ ছিলাম ব’সে;/শিশির পড়িতেছিল ধীরে-ধীরে খ’সে;/নিমের শাখার থেকে একাকীতম কে পাখি নামি/উড়ে গেলো কুয়াশায়,-কুয়াশার থেকে দূর-কুয়াশায় আরো…।
আবহাওয়া অফিস বলছে, টাঙ্গাইলে এখন থেকে যত দিন যাবে ততোই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য কমবে। পার্থক্য কমলে বাড়বে শীত। ইংরেজী মাসের হিসাবে বললে, নভেম্বর পুরোটা এভাবে যাবে। ডিসেম্বর থেকে জোরে বইবে শীতের হাওয়া। অগ্রহায়ণ হাত ধরে নিয়ে যাবে পরিপূর্ণ শীতের কাছে। শস্য-শ্যামলা সোনার বাংলাকে দৃশ্যমান করবে ক্রমশ।
হ্যাঁ, ফসলের ঋতু হিসেবেও গণ্য করা হয় অগ্রহায়ণকে। কিছুকাল আগে কার্তিক মাসটি ছিল অনটনের। ফসল হতো না। দেশের কোন কোন অঞ্চলে খাদ্যাভাব দেখা দিত। শূন্য হয়ে যেত ধানের গোলা। কার্তিককে তাই ‘মরা কার্তিক’ বলে ভর্ৎসনা করা হতো। রবীন্দ্রনাথের কবিতায়ও সময়টির বর্ণনা পাওয়া যায়। কবিগুরু লিখছেন: শূন্য এখন ফুলের বাগান, দোয়েল কোকিল গাহে না গান,/কাশ ঝরে যায় নদীর তীরে…।
তবে যত দিন যাচ্ছে ততোই বদলাচ্ছে হিসেব-নিকেষ। এখন আগের সে অভাব নেই। শস্যের বহুমুখীকরণের ফলে মোটামুটি সারা বছরই ব্যস্ত টাঙ্গাইলের কৃষকরা। বিভিন্ন ফসল ফলান তারা। আয় রোজগারও বেশ। পাশাপাশি এখন কার্তিক মাসেই হৃষ্টপুষ্ট হয়ে ওঠে আগাম আমন ধানের শীষ। পাকা ধান কাটা শুরু হয়ে যায়।
সামনের দিনগুলো আরও বেশি আনন্দের হবে। অগ্রহায়ণের শেষে টাঙ্গাইল মাতবে নবান্ন উৎসবে। এ সময় আমন ধান কাটা শুরু হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসেব মতে, টাঙ্গাইলের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফসল উৎপাদনের সময় এটি। নতুন ধানে চলে নবান্ন উৎসব। সব মিলিয়ে দারুণ একটা ঋতু। ফলে ফসলে যারপরনাই সমৃদ্ধ। প্রাকৃতিক পরিবর্তনগুলোও, আহ, কী যে উপভোগ্য! ক্রমে সব পরিবর্তন সামনে আসবে। আজকের ছেলে মেয়েরা মোবাইল ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ একটু সরিয়ে অগ্রহায়ণকে দেখবে। গাড়ির জানালার গ¬াস নামিয়ে গায়ে মাখবে হিমেল হাওয়া। এই প্রত্যাশা কি করা যায়?

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ