শ্রাবণ দিনে মেঘদূতের খেলা, রিমঝিম ছন্দ… মুষলধারায় বৃষ্টি পড়ছেই

শেয়ার করুন

ফাহাদ শাওন ॥
দিনরাত ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরছেই। কিছু সময় পরই মুষলধারায় বৃষ্টি। তারপর আবার কিছুক্ষণের বিরতি। আকাশে মেঘের আনাগোনা। ফের এই মেঘ, আবার শুরু এই বৃষ্টি। এবারের শ্রাবণ মাসে এমনই ক্লাসিক্যাল সুর। চোখেও পড়েছে। মনেও ধরেছে। এমনই রিমঝিম ছন্দে এবারের শ্রাবণ এগিয়ে যাচ্ছে শরতের পানে। আকাশে মেঘ দূতের খেলায় মেঘ বৃষ্টির ধারাপাত। টিনের চালায় বৃষ্টির নূপুর নিক্বণকে মনে হবে শ্রাবণের নামতা পাঠ।
এই সময়টায় আকাশে সাদা-কালো মেঘেদের ছুটোছুটি দেখে মনে হবে মহামিলনের আয়োজন। রবীন্দ্রনাথের সুর ভেসে আসে ‘মেঘ বলেছে যাবো যাবো রাত বলেছে যাই/ সাগর বলে কূল পেয়েছি আমি তো আর নাই…’। শ্রাবণের মধ্যভাগে মেঘমঞ্জরি বৃষ্টির ক্লাসিক্যাল সুরকে সঙ্গে নিয়ে শরতকে স্বাগত জানাতে বরণ ডালা সাজাবার পালা শুরু করেছে। বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের যে ঢেউ বঙ্গোপসাগরে নাচন তুলেছে তারই রেশ গিয়ে পড়েছে ঋতুর পালাবদলে। ‘আজি ঝর ঝর মুখর বাদর দিনের’ সুর মালা শরতের গলে পরাতে এগিয়ে এসেছে। দুই ঋতুর মধুর মিতালির এমন ছন্দ ধরাধামে লুকোচুরি খেলছে। যেখানে উদাসী মেঘলা মন ভেসে বেড়াচ্ছে সুদূর নীলিমায়।
যুগে যুগে শিল্পী কবি-সাহিত্যিক মানব মনের হৃদয়নাভূতিকে মেঘের জলধারায় বৃষ্টিতে সঞ্চারিত করেছেন। যেখানে কখনও সখনও কোন ভাললাগাও বিরহ কাতর যন্ত্রণায় বুক ভারি করে তোলে। ভালবাসার গভীরে তলিয়ে যেতে থাকে। এমনই ধারায় শিল্প, সাহিত্য ও সঙ্গীতে বর্ষা ও শরৎ পেয়েছে ধ্রুপদ লয়ের চিরন্তন মর্যাদা। মৃদু সুরের এমন ব্যঞ্জনা শহরের কংক্রিটের বনে ধরা দেয় না। যেখানে বিকেলের সোনা রোদ ঢেকে গিয়েছে। মানুষের শোরগোলে কোন সুর কানে বাজে না। গ্রামের পথে পা বাড়ালে চোখে পড়বে: বর্ষার জল জমিতে থিতু হয়ে আছে। প্রতিচ্ছায়া পড়েছে নীল আকাশের সাদা মেঘের ভেলা। তারই ধারে গাঁয়ের লোক জাল ফেলেছে। কিছু দূরে খেয়া জাল ফেলেছে মাঝি। ছোট ও মাঝারি মাছগুলো লাফিয়ে উঠছে সেই টানা ও খেয়া জালে।
শ্রাবণের গোধূলি বেলায় মনে হবে বর্ষা কবিগুরুর ভাষায় কথা বলছে ‘গোধূলী লগনে মেঘে ঢেকে ছিল তারা/আমার যা কথা ছিল হয়ে গেল সাড়া/ হয়তো সে তুমি শোন নাই/সহজে বিদায় দিলে তাই/আকাশ মুখর ছিল যে তখন ঝরঝর বারিধারায়…..।’ এই পঙ্ক্তি প্রকৃতির নিসর্গের ভাষায় বলে: শ্রাবণের বেলায় বর্ষা তার কথা বলে দিয়েছে। মেঘেরও হয়তো তা শোনেনি তাই সহজে বিদায় দিয়েছে টানা বারিধারায়।
বাংলার ষড় ঋতুর বৈচিত্র্যে অনেকটা সময়জুড়ে থাকে মেঘ বৃষ্টি। তপ্ত দিনের রৌদ্রছায়ায় বৃষ্টি অধিকার প্রতিষ্ঠায় ঘন কালো মেঘ জড়ো করে। বর্ষা ও শরতে সকল ধরনের মেঘ আকাশের দখল নিয়ে নেয়। মনে হবে মেঘেদের মিলনমেলা। কোনটি ধূমল, কোনটি গৈরিক, কোনটি ফুরফুরে পেঁজা পেঁজা। তাদের কত নাম। কাদাম্বনী, জলদ, জলধর, সেক্তা, ধূমল, অভ্র। এদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে মেঘপুস্প (বৃষ্টি), মেঘাগম (বর্ষা), মেঘ বহ্নি (বিজলী), মেঘাত্যয় (শরত), মেঘ ভাঙ্গা (রোদ), মেঘ যামিনী, মেঘনীল, মেঘসখা… মেঘেদের আরও কত নাম। ওদের এত ক্ষমতা যে, ইচ্ছে হলেই দিনে সূর্য রাতে চাঁদ মামাকে ঢেকে দেয়। আকাশজুড়ে নানা বর্ণের মেঘ। মেঘের আরেক পারেই রংধনু। জলেভেজা কেতকি (কেয়া) দূর থেকে সুবাস এনে দেয়। গ্রামের ঝাউবনে, বাঁশ বাগানে, নদীতীরে চর এলাকায় বর্ষায় বেশি ফোটে নাম না জানা কত বনফুল। যা দৃষ্টিতে এসে মন রাঙ্গিয়ে দেয়। শ্রাবণের ধারায় এই ফুলগুলো নেচে ওঠে।
এমন দিনগুলোতে মানব মনও উদাসী হয়ে ওঠে। মেঘের সঙ্গে মানুষের মনের তুলনা করা হয়। মেঘের মতোই মানুষের মনও কত বিচিত্র। কখন ছুটে চলে যায়। কখন যে চোখের কোন থেকে এঁকেবেঁকে অশ্রুর স্রোতরেখা ঠোঁটের প্রান্তে এস বৈশাখী নদী হয়ে যায়…..। মানব মনের অনেক কিছুই মেঘ ও বৃষ্টিকে ঘিরে হৃদয়ে দোলা দেয়। রিমিঝিম বৃষ্টির ছন্দে অদৃশ্যে মুখোমুখি দু’জন মানব-মানবী। হৃদয় দিয়েই হৃদয়ে কাছে পাওয়ার অনুভূতি। অব্যক্ত কথাগুলো মনে মনেই বলা। সবই মেঘের খেলা। নীল আকাশে মেঘের ভেলা। প্রকৃতিই মানব হৃদয়ের সেতুবন্ধন রচনা করে, যা প্রকৃতির রহস্যময় সৌন্দর্য!
ঋতু বৈচিত্র্যে এবার তেমনই সুর বেজে উঠেছে প্রকৃতিতে। মেঘের পরে মেঘ জমে ঋতু কতই না খেলা খেলছে। এই তো শরতের কাশবনের ফুল ফোটা শুরু হয়ে গেল বলে…।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

ব্রেকিং নিউজঃ