শোক ও শপথের আগস্ট মাস

শেয়ার করুন

বাঙালির জীবনে হাজার বছরের চেয়েও লম্বা মাস আগস্ট। লক্ষ লক্ষ টন ভারি আগস্টের ভার বাঙালি আর কতদিন বইবে! ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, কালের মহানায়ক-মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বর শেখ মুজিবুর রহমানের রক্তস্নাত বিদায়কে সকল বিদায়ের ঊর্ধ্বে রাখে বাঙালি- বাংলাদেশ। এখনো আগস্ট এলে শোকাতুর শ্রাবণের আকাশ অবিরাম কাঁদতে থাকে, তার চোখ ফেঁটে ঝরতে থাকে বেদনার নীল অশ্রু। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকায়, গুড়–ম গুড়–ম আওয়াজ শুনে চমকে উঠি। দুয়ারে কড়া নাড়ে আগস্ট! আগস্ট মানেই তো বুটের আওয়াজ, গ্রেনেডের শব্দ, অসহায় জাতির করুণ আর্তনাদ। ওহ! কি করে ভুলি আগস্টের কথা! আমি যে বাঙালি। সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা ‘আমার পরিচয়’ মনে করিয়ে দেয়-
‘এই ইতিহাস ভুলে যাব আজ, আমি কি তেমন সন্তান?
যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান।’
শুধু কি শেখ মুজিব! বাংলা ভাষা ও সাহিত্য রবি (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জন্ম-৭ মে, ১৮৬১; মৃত্যু-৭ আগস্ট, ১৯৪১) হারা হল আগস্টে। প্রেম আর দ্রোহের নির্বাক কবি নজরুল ইসলাম (২৪ মে, ১৮৯৯-২৯ আগস্ট,১৯৭৬) চলে গেলেন আগস্টে। প্রথার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে হুমায়ুন আজাদ(২৮এপ্রিল ১৯৪৭- ১১ আগস্ট, ২০০৪) কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু হয়ে ঝরে পড়লেন, সেও আগস্টে। স্বাধীনতার যমজ কবিতা প্রসব করে আসাদের শার্ট গায়ে চাপালেন নিঃসঙ্গ শেরপা- আরবান কবি শামসুর রাহমান (২৩ অক্টোবর, ১৯২৯-১৭ আগস্ট, ২০০৬)। ভেবেছিলেন এ যাত্রা পাড় পাবেন, কিন্তু গ্রেনেডের কাছে স্যারেন্ডার করে আগস্টের জালেই বন্দি হলেন মহীয়সী নারী আইভি রহমান (৭ জুলাই, ১৯৩৬-২৪ আগস্ট, ২০০৪)। প্রিয়তম ক্যামেরাকে নিঃসঙ্গ করে মিশুক মুনীর (আশফাক মুনীর-২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৯- ২০১১), আর খাঁচা ভেঙে উড়াল দেয়া মাটির ময়না তারেক মাসুদ(৬ ডিসেম্বর, ১৯৫৬-২০১১) মুক্তির গান গাইলেন একই দিনে, আগস্টের আনলাকি থার্টিনে। ক্যাথরিন মাসুদ এই দুইজনকে বলেছেন চলচ্চিত্রের সৈনিক। কারণ সৈনিক যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যায়, মিশুক-মাসুদও চলচ্চিত্র করতে গিয়ে চিরদিনের জন্য কালের মহাসড়কে হারিয়ে গেলেন। এতো নামীদের তালিকা, বহু নাম পরিচয়হীন বাঙালি পিনাকের সাথেই পদ্মা, মেঘনা, যমুনার বুকে হারিয়ে গেল, এই আগস্টেই। কাঁদো বাঙালি, কাঁদো।
মৃত্যুতো মৃত্যুই। প্রতিটি পরিবার প্রিয়জনকে হারিয়ে সমানভাবেই বিলাপ করে। কিন্তু কিছু মৃত্যু দেশ-মহাদেশের গন্ডি পেড়িয়ে পুরো পৃথিবীকে নির্বাক করে দেয়। প্রচন্ড ক্ষুধাতুর দুধের শিশুর চোখের পানি চোখেই শুকায়। পথহারা পাখিরাও খাবি খায়। মাজারের গা থেকে খসে পড়ে লালসালু। মাতৃজঠোরে আর পদাঘাত করেনা অনাগত সোনামনি। হ্যাঁ, আমার গন্তব্য ৩২ নং বাড়ি, ৩২ নং সড়ক, বাংলার হৃদপিন্ড। শেখ মুজিব তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেন- ‘ছেলেমেয়েদের জন্য যেন একটু বেশি মায়া হয়ে উঠেছিল। ওদের ছেড়ে যেতে মন চায় না, তবুও তো যেতে হবে। দেশ সেবায় নেমেছি, দয়া মায়া করে লাভ কি? দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালোবাসলে ত্যাগ তো করতেই হবে এবং সে ত্যাগ চরম ত্যাগও হতে পারে।’ (ঢাকাঃ দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০১২, পৃষ্ঠা ১৬৪) । দেশের মানুষকে ভালোবেসে চরম ত্যাগই করলেন তিনি। তবে কালের গর্ভে তিনি সমর্পিত হননি, হলেন অকালের বলি। রেহাই পেলনা আট বছরের সাদা পায়রা রাসেলসহ ১৭ জন (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ৩০২)।
সবার মৃত্যু জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিমন্ডলে সমানভাবে নাড়া দেয় না। আগস্ট তিন যুগ¯্রষ্টা মহানায়কের মহাপ্রয়াণ ঘটিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-মুজিবুর। মহামানবের মহাপ্রয়াণ শুধু শোকের উদ্রেক করে না, শক্তিও জোগায়। উন্নত দেশে নাকি মহানদের মৃত্যুদিন শোক দিবস না, স্মরণ দিবস হিসেবে পালন করে। বাংলাদেশেও রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-মুজিবের প্রয়াণ দিবসে জাতি গভীর শ্রদ্ধাভরে তাঁদের স্মরণ করে। আলোচনা সভা করে তাঁদের শিক্ষাকে সবার ভেতরে ছড়িয়ে দেবার দৃপ্ত শপথ নেয়। ইংরেজি অগাস্ট শব্দের আরেকটি অর্থ শ্রদ্ধা উদ্রেককারী। তাই আগস্ট তো আমাদের শক্তি ও সম্ভ্রম জাগানিয়া মাসও। ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল-’ রবীন্দ্রনাথের গানই নাকি বালক শেখ মুজিবের মনে অসাম্প্রদায়িকতার বীজ রোপণ করেছিল। স্বদেশ প্রেম আর সোনার বাংলা অভিধাটিও তাঁর রবি ঠাকুরের কাছ থেকেই পাওয়া। জেলে তাঁর সদা সঙ্গী ছিল সঞ্চয়িতা। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহের সঞ্চয়িতা কপিটি জেলে যাবার কালে হাতে নিয়ে যেতেন। ‘কপিটি নাকি জেলের সেন্সরের বহু সিল আর অধিক ব্যবহারে জীর্ণ হয়ে গিয়েছিল।’ (ড. আনোয়ারুল ইসলাম, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সুপ্রভাত বাংলাদেশ, ৬/৫/১৪)। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বাঙালি জাতির মহানায়ক মুজিবের সহচর আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী শেখ সাহেবের ভেতর রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতার প্রতি অসীম অনুরাগ দেখেছেন। রবি-নজরুলই শেখ মুজিবকে নানা সংকট থেকে উত্তরণের প্রেরণা যুগিয়েছে বারবার। মুজিবের রবীন্দ্র- প্রেম কবিতায়ও জায়গা পেয়েছে-
‘লুঙ্গির উপর সাদা ফিনফিনে ৭ই মার্চের পাঞ্জাবি,
মুখে কালো পাইপ, তারপর হেঁটে গেছে বিভিন্ন কোঠায়।
সারি সারি মৃতদেহগুলি তোমার কি তখন খুব অচেনা ঠেকেছিল?
তোমার রাসেল? তোমার প্রিয়তমা পতœীর সেই গুলিবিদ্ধ গ্রীবা?
তোমার মেহেদীমাখা পুত্রবধূদের মুজিবাশ্রিত করতল?
রবীন্দ্রনাথের ভূলুণ্ঠিত ছবি?
তোমার সোনার বাংলা?’
(নির্মলেন্দু গুণ, সেই রাত্রির কল্পকাহিনী)
রবি-নজরুল-মুজিব-‘বাঙালি পরিচয় বা একই মাসে মৃত্যু তাদের বড় যোগসূত্র নয়; তাদের মধ্যে বড় যোগসূত্র সৃষ্টি করেছিল বিশ্বমানবতা, স্বদেশ প্রেম ও স্বাধিকার চেতনা।’ (আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, ইত্তেফাক, ১৫/৮/২০১৪)। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিছু লেখার সুযোগ ছিল না রবীন্দ্রনাথের। তবে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের (নভেম্বর ৫, ১৮৭০, জুন ১৬, ১৯২৫) অকালমৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ’এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান’। শুধু দেশবন্ধু কেন, বঙ্গবন্ধুও মৃত্যুহীন। না ফেরার দেশে যাত্রার জন্য বেছে নেয়া প্রিয় মাস শ্রাবণের কোলে নিজেকে ঢেলে দিয়ে রবীন্দ্রনাথও মৃত্যুহীন হয়ে আছেন। মৃত্যুহীন নজরুলও আমাদের দেশপ্রেম ও বিপ্লবের আধার। মনে হয় এই তিনজন মিলেই লিখেছিলেন-
‘মোর লাগি করিওনা শোক
আমার রয়েছে কর্ম
আমার রয়েছে বিশ্বলোক।’
এই তিন মহানই বিশ্ব মানবতা আর শান্তিতে আত্মনিবেদন করেছিলেন। শেখ মুজিব জুলিওকুরি শান্তি পুরস্কার পেয়ে বঙ্গবন্ধু থেকে বিশ্ববন্ধু হয়েছিলেন। রবীন্দ্র-নজরুলও মানব মুক্তির গান গেয়ে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রেখে গেছেন। এদিক থেকেও আগস্ট আমাদের শান্তির দূত- শ্বেত পায়রার ডানা ঝাপ্টানোর শব্দ শোনায়। আগস্ট আমাদের শপথের মাস। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘যে কোনো মহৎ কাজ করতে হলে ত্যাগ ও সাধনার প্রয়োজন। যারা ত্যাগ করতে প্রস্তুত নয় তারা জীবনে কোনো ভালো কাজ করতে পারে নাই’ (‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পৃষ্ঠা, ১২৮)। আসুন দেশের জন্য, জাতির জন্য ত্যাগের এই মহান শপথ নিই।
সিদ্ধান্ত নিতে হবে, শোকে-ক্ষোভে-আবেগে আগস্টকে বছরের ক্যালেন্ডার থেকে কাঁচা দাঁতের মত উপড়ে ফেলব! নাকি আগস্টই হয়ে উঠবে আমাদের সম্মুখে চলার অবিনাশী গান। চলুন ভাঙ্গি গোঁড়ামীর লৌহ কপাট, করি মুক্তির সংগ্রাম, প্রাণে ছোঁয়াই আগুনের পরশমণি। বাদল ঝরা শাওন-ভাদ্রে, বিদ্যুতের চমকে কেটে যাক আগস্টের সবটুকু আঁধার।
মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল- সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি- সাংবাদিক ও কলাম লেখক। ১৯৮২ সাল থেকে বিভিন্ন জাতীয় পত্র-পত্রিকার বিভাগীয় সম্পাদক/সহ-সম্পাদক/ প্রতিনিধি এবং স্থানীয় বিভিন্ন পত্রিকায় ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক/ নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন। প্রকাশিতব্য গ্রন্থ ৬টি। বর্তমানে দৈনিক যায়যায়দিনের স্টাফ রিপোর্টার(টাঙ্গাইল), জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার টাঙ্গাইল জেলা ইউনিট’র সভাপতি এবং সম্প্রচারে আসার অপেক্ষায় থাকা দৃষ্টি টিভি’র(আইপি টিভি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

ব্রেকিং নিউজঃ