Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!

মধুপুরে কৃষকদের বিষমুক্ত আনারস চাষে সংগ্রাম

শেয়ার করুন

মধুপুর সংবাদদাতা ॥
টাঙ্গাইলের সিংহভাগ আনারস চাষ হয় আনারসের ‘রাজধানী’ খ্যাত মধুপুরে। রসে ভরা এ ফলটি স্বাদ ও গন্ধে একসময় ছিল অতুুলনীয়। কিন্তু অতীতের সেই ঐতিহ্য হারাতে বসেছিল। ফলে বিষাক্ত রাসায়নিক অতিরিক্ত প্রয়োগের মাধ্যমে আনারস আকারে বড় এবং আকর্ষনীয় রঙ তৈরি করায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল এর স্বাদ-গন্ধ ও গুণাগুণ। তবে এখন পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। অতিরিক্ত রাসায়নিক দিয়ে পাকানো আনারসের পাশাপাশি বিষমুক্ত আনারসও চাষ হচ্ছে মধুপুরে।
বিগত ২০১৪ সাল থেকে মধুপুরের কয়েকজন চাষী রাসায়নিকমুক্ত আনারস চাষ শুরু করেন। এটি করতে গিয়ে শুরুতেই মোটা অঙ্কের টাকা ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। এতে তারা হতাশ হলেও ভেঙে পড়েননি। তাদের এ সংগ্রাম চালিয়েই যাচ্ছেন। এবার কিছুটা সুফলও আসতে শুরু করেছে। বিষমুক্ত আনারসের চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে আনারসের অতীত ঐতিহ্য আবার ফিরে আসবে বলে আশা করছেন মধুপুরে আনারস চাষের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তা না হলে রাসায়নিকের কবল থেকে আনারসকে রক্ষা করা যাবে না বলে জানান তারা ।
সারাদেশে জুড়ে পরিচিতি রয়েছে শালবন খ্যাত টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়াঞ্চল। এই পরিচিতিকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে ‘লালমাটির ফসল’ আনারসে। মধুপুরের বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা টিনিউজকে জানান, তাদের প্রায় সবাই রাসায়নিকমুক্ত আনারস আবাদ করতে চান। কিন্তু ক্ষতির আশঙ্কায় তারা সেটা পারছেন না। ভোক্তাদেরকে রাসায়নিকমুক্ত আনারস কিনতে উদ্ধুদ্ধ করতে পারলে, তাদেরকে ভাল-মন্দ আনারস চেনানোর ব্যবস্থা করা হলে রাসায়নিকমুক্ত আনারস আবাদ করা যাবে। মধুপুরের মহিষমারা গ্রামের বিষমুক্ত আনারস চাষী ছানোয়ার হোসেন টিনিউজকে জানান, আগে প্রতি বছরই আনারস বড় এবং পাকানোর জন্য তিনি ক্ষেতে রাসায়নিক প্রয়োগ করতেন। হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নেই মানুষের ক্ষতি করে এমন মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক আর প্রয়োগ করবো না। তাই আমি বিগত ২০১৪ সালে প্রায় দুইশ’ শতাংশ জমিতে রাসায়নিকমুক্ত আনারস আবাদ শুরু করি। আনারস আকারে বড় এবং পেকে হলুদ রঙ না হওয়ায় বাজারে তার আনারসের চাহিদা কম হয়। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে না পারায় প্রথম অবস্থায় প্রায় ৫০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়। তবু রাসায়নিক প্রয়োগের মাধ্যমে আনারস বড় ও পাকানোর বিপক্ষে। এবারও দেড়শ’ শতাংশ জমিতে বিষমুক্ত আনারস চাষ করছি। শুধু কৃষক চেষ্টা করলে হবে না। ভোক্তাদের রাসায়নিকমুক্ত আনারস কিনতে সচেতন হতে হবে। তারা চাকচিক্য দেখে আনারস কিনেন। আকারে বড়, আকর্ষণীয় রঙ হলেই আনারস ভাল হয় না। একসঙ্গে রাসায়নিকমুক্ত ও রাসায়নিকযুক্ত আনারস রাখা হলে রাসায়নিকযুক্তটাই ক্রেতারা পছন্দ করে কিনে নেন। যদি তা না হয় তাহলে কৃষক রাসায়নিকমুক্ত আনারস চাষে উৎসাহিত হবে এবং এক সময় দেখা যাবে বাজারে কোন বিষাক্ত আনারস নেই। গ্রামে শহরে বিভিন্ন হাট, বাজারে নির্দিষ্ট দোকান থাকলে যেখানে বিষমুক্ত আনারস বেচা কেনা করা যাবে, তাহলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের জন্য ভালো হতো। আমরা যেমন বিক্রির নিশ্চয়তা পেতাম, তেমনি ক্রেতাও বিষমুক্ত আনারস কিনতে পারতো।
একই গ্রামের হাফিজ উদ্দিন টিনিউজকে বলেন, আমরা চেষ্টা করছি বিষমুক্ত আনারস আবাদের। কিন্তু এর চাহিদা থাকলেও ক্রেতাদের কাছে সরাসরি এ আনারস পৌছানো যাচ্ছে না। দশ-বিশটি আনারসের জন্য সাধারণ ক্রেতারা মধুপুর আসতে পারছে না আবার আমরাও তাদের কাছে পৌছাতে পারছি না। তবে এতে পরিবহনের সমস্যা রয়েছে। মধুপুর চালা এলাকার দেলোয়ার হোসেন টিনিউজকে বলেন, বিষমুক্ত আনারস আকারে ছোট এবং রঙও ভালো না। এছাড়া নরম থাকায় বহন করতেও সমস্যা। ফলে সময় মতো বিক্রি করতে না পারলে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।
মধুপুর উপজেলার জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক টিনিউজকে বলেন, মধুপুরে আদিবাসীদের মধ্যেও বিষমুক্ত আনারস চাষীর সংখ্যা বাড়ছে। তারা নিজেদের খাবারের পাশাপাশি বিক্রির জন্য বিষমুক্ত আনারস চাষ করছে। বিষমুক্ত আনারস কেচা-বেচায় ব্যাপক প্রচারণা দরকার। এতে কৃষকরা বিষমুক্ত চাষে উৎসাহিত হবে।
এ ব্যাপারে মধুপুর উপজেলার অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা আদনান বাবু টিনিউজকে বলেন, রাসায়নিক দেয়া আনারস দেখতে বড় এবং সম্পূর্ণ হলুদ রঙ হয়ে পাকে। আর রাসায়নিকমুক্ত আনারস কখনো সম্পূর্ণ হলুদ রঙ হয়ে পাকে না। নিচ থেকে পাকে আর উপরের অংশে কাচা থাকে। এই বিষয়টি ক্রেতাকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ফল বড় করা, একত্রে বাজারজাত করা এবং ভোক্তাকে আকৃষ্ট করার জন্য অনেকে নিয়ম না মেনে একাধিকবার হরমোন ব্যবহার করে। এটিই ক্ষতির কারণ। এ ব্যাপারে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। মানুষও আস্তে আস্তে সচেতন হচ্ছে। এবার বিষমুক্ত আনারসের চাহিদা বেড়েছে। আবাদও হয়েছে বেশি। রাসায়নিক প্রয়োগ করে আনারস আবাদ ভবিষ্যতে আরো কমে আসবে। মধুপুর থেকে বিষমুক্ত আনারস রপ্তানির চিন্তাভাবনা চলছে বলে তিনি জানান।
এ ব্যাপারে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের কনসালটেন্ট ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. সুজা উদ্দিন তালুকদার টিনিউজকে বলেন, আনারসে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে মানুষের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হতে পারে। দেহের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হতে পারে। হাড় ও অস্থির ক্ষয়রোগ হয়ে সামান্য আঘাতে এগুলো ভেঙে সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করতে হতে পারে। এছাড়া ডায়াবেটিস, প্রেসার বেড়ে স্ট্রোক ও হার্ড অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। আর বিষমুক্ত আনারস খেলে মানবদেহের পানিশুন্যতা, কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর হবে। ভিটামিন সি এবং পানির চাহিদা পূরণ হবে। এছাড়া শরীরের দূষিত পদার্থ বেরিয়ে যাবে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

ব্রেকিং নিউজঃ