ভূঞাপুরে কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম চলে গরুর ঘরে

শেয়ার করুন

ভূঞাপুর সংবাদদাতা ॥
‘শেখ হাসিনার অবদান, কমিউনিটি ক্লিনিক বাঁচায় প্রাণ’ এ স্লোগানে দেশে তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ায় জন্য সরকার বিভিন্ন উপজেলায় কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করেছেন। সেই অনুযায়ী কার্যক্রমও পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু এর উল্টো চিত্র টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার শুশুয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের। কমিউনিটি ক্লিনিকের উন্নয়নের নামে প্রকল্প দিলেও কাগজে-কলমেই তা সীমাবদ্ধ। বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। এমনকি গরুর ঘরে বসে পরিচালিত হচ্ছে এ ক্লিনিক বলে অভিযোগ উঠেছে। এই প্রকল্পের কোটি টাকা আত্মসাতেরও অভিযোগ উঠেছে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, ভূঞাপুর উপজেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে যমুনা নদীবেষ্টিত বিস্তীর্ণ অর্জুনা ইউনিয়নের শুশুয়া ওয়ার্ড। এ ওয়ার্ডে প্রায় ৮ হাজার জনসংখ্যার জন্য একটি কমিউনিটি ক্লিনিক। বিগত ২০০৯ সালের বন্যায় কমিউনিটি ক্লিনিকের ভবনটি যমুনায় ভেঙে যায়। এরপর থেকে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে কখনো স্কুল মাঠে, কখনো মাদ্রাসা মাঠে, কখনো বিভিন্ন জনের বাড়ির উঠানে বসে। সরেজমিনে দেখা যায়, শুশুয়া গ্রামে মমিনুল নামক এক ব্যক্তির বসতঘরে ভাঙা আলমারিটা রাখলেও ঘরে রোগী বসার কোনো জায়গা নেই। বাধ্য হয়ে বেছে নেয়া হয়েছে গরুর খাবার ঘরটি। সেখানে বসেই এ ক্লিনিকের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
এদিকে এ ক্লিনিকের নামে দফায় দফায় প্রকল্প দিয়ে কয়েক লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। বিগত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে লোকাল গভর্নেন্স সাপোর্ট প্রজেক্ট (এলজিএসপি-৩) এর উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ৪৭টি প্রকল্পে ১ কোটি ১০ লাখ ৭৭ হাজার ৪৮৮ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে তালিকার প্রথম প্রকল্পটি শুশুয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের ঘর নির্মাণের জন্য ৫ লাখ টাকা, যা কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ। ঘরতো দূরের কথা ওই ওয়ার্ডে কমিউনিটি ক্লিনিকের কোনো ঠিকানাও নেই। অন্যদিকে এ কমিউনিটি ক্লিনিকের ঘর নির্মাণের জন্য ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ধুম্রজাল। বিগত ২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর উপজেলা পরিষদের সভার রেজ্যুলেশন কপি জেলা কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়। কিন্তু সম্প্রতি অর্জুনা ইউনিয়ন পরিষদের প্রকল্প তালিকায় একই তারিখ একই সময়ে প্রতিস্থাপন দেখিয়ে শুশুয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের ঘর নির্মাণের জন্য ৫ লাখ টাকার প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে ইউনিয়নের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসবাবপত্র বিতরণ দেখানো হয়।
এ নিয়ে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে নানা আলোচনা সমালোচনার ঝড়। এলজিএসপি নীতিমালায় এ ধরনের কোনো নিয়ম না থাকলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি প্রকল্প পরিবর্তন করে কাজ করা হচ্ছে। ক্লিনিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার কুলসুম টিনিউজকে বলেন, আমি বিগত ২০১১ সাল থেকে এই ক্লিনিকে কর্মরত আছি। বিভিন্ন সময়ে স্কুল, মাদ্রাসা, বিভিন্ন ব্যক্তির বাড়িতে বসে অফিস করছি। এ ক্লিনিকের নিজস্ব কোনো অফিস ঘর নাই। কখনো কোনো সরকারি অনুদান এসেছে কিনা আমার জানা নাই।
জানা গেছে, এ প্রকল্পের আওতায় গাবসারা ও ভদ্রশিমুল উচ্চ বিদ্যালয়ের ঘর নির্মাণ বাবদ ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কোনো কাজ করা হয় নাই। এ বিষয়ে গাবসারা উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আজহারুল ইসলাম টিনিউজকে বলেন, লোকমুখে শুনেছি যে আমাদের স্কুলে ঘর নির্মাণের জন্য ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ আছে। কিন্তু স্কুলে এক টাকারও কাজ করা হয় নাই। আমরা কোনো চিঠিপত্র পাই নাই। ভদ্রশিমুল উচ্চ বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বাবলু ভূইয়া টিনিউজকে বলেন, বিদ্যালয়ের বারান্দা নির্মাণের জন্য এমপি মহোদয় ১ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছিলেন, সেটির কাজ হয়েছে। এছাড়া কোন ঘর নির্মাণ করা হয় নাই। কোন বরাদ্দ আছে কি না জানা নাই।
একই প্রকল্পে ইউনিয়নগুলোতে দুঃস্থ পরিবারের মাঝে নলকূপ বিতরণ, স্যানিটারি ল্যাট্রিন স্থাপন, সেলাই মেশিন বিতরণসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পে প্রায় কোটি টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়। কিন্তু এসব প্রকল্পের বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। সবই শুভঙ্করের ফাঁকি। অর্জুনা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য লিয়াকত হোসেন রনি টিনিউজকে বলেন, শুধু এলজিএসপি প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ হয় নাই এক প্রকল্প বারবার দেখিয়ে টিআর, কাবিখা, কাবিটা প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা হরিলুট হচ্ছে। হতদরিদ্রের কর্মসৃজন প্রকল্পের লাখ লাখ টাকার চেক জাল স্বাক্ষর করে লুট হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে সরকারের উন্নয়নের ধারা ধূলিসাৎ এবং ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হবে।
এ ব্যাপারে ভূঞাপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আব্দুল হালিম টিনিউজকে বলেন, এলজিএসপি প্রকল্পের বিষয়ে আমি অবগত নই, অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
এ বিষয়ে ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঝোটন চন্দ টিনিউজকে, কিছু মৌখিক অভিযোগ পেয়েছি। এ বিষয়ে উদ্ধর্তন কর্তৃপক্ষ অবগত রয়েছেন। তদন্ত শেষে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের টাঙ্গাইলের উপ-পরিচালক শরীফ নজরুল ইসলাম টিনিউজকে বলেন, এ প্রকল্পের কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি পাওয়া গেলে স্থানীয় সরকার আইন-২০০৯ এর ৩৪ ধারা মতে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ব্রেকিং নিউজঃ