Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!

ভারতেশ্বরী হোমসের প্রতিভা মুৎসুদ্দি একজন অকুতোভয় ভাষা সৈনিক

শেয়ার করুন

কাজল আর্য ॥
পৃথিবীতে এমন কিছু মহা মানুষের জন্ম হয় যারা তাদের জীবন যৌবন উৎসর্গ করেন মানব কল্যাণে এবং পরোপকারেই পান আত্মতৃপ্তি। একজন ব্যক্তি তার অর্জিত জ্ঞান যথাযথ পরিবেশনা এবং অব্যাহত শুভ কর্মের দ্বারা জাতি বা গোষ্ঠীকে আলোকিত করার প্রয়াসের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন অন্যন্য উচ্চতায়। বহু প্রতিভার অধিকারিনী প্রতিভা মুৎসুদ্দি (৮৪) একজন নারী নন প্রতিষ্ঠান সমতুল্য। রক্ষণশীল সমাজের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে নারী শিক্ষার জাগরণ এবং উন্নয়নে তার ভূমিকা অতুলনীয়। প্রচার বিমুখ চিরকুমারী প্রতিভা মুৎসুদ্দির জীবন সংগ্রামময় ও অনুকরণীয়।
নারী শিক্ষা উন্নয়নের অন্যতম অগ্রদূত প্রতিভা মুৎসুদ্দির জম্ম ১৯৩৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার মহামুনী পাহাড়তলী গ্রামে। তার বাবা কিরণ বিকাশ মুৎসুদ্দি ছিলেন খ্যাতনামা আইনজীবী এবং মাতা শৈলবালা মুৎসুদ্দি আদর্শ গৃহিনী। ৫ বোন ৪ ভাইয়ের মধ্যে তিনি ৩য়। পরিবারের সদস্যরা তাকে আদর করে বেবি বলে ডাকতেন। চট্টগ্রামের পাথরঘাটায় মেনকা স্কুলের তিনি শিক্ষা জীবন শুরু করেন। ১৯৪৯ সালে ডা: খাস্তগীর স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৫১ সালে চট্টগ্রাম সরকারী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। ১৯৫৪ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকেই অর্থনীতিতে প্রথম বর্ষ সম্পন্ন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসেন। ১৯৫৬ সালে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এ সময় ডাকসুতে ছাত্র ইউনিয়ন প্যানেল থেকে মহিলা মিলনায়তন সম্পাদিকা নির্বাচিত হন। ১৯৫৫-১৯৫৭ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের (তৎকালীন উইমেন্স হল) প্রথম সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। সংখ্যালঘু ছাত্রী নিবাস বিদ্যার্থিনী ভবনে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবেও কাজ করেন। তিনি ১৯৫৯ সালে এমএ এবং ১৯৬০ সালে ময়মনসিংহ মহিলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন।
উচ্চ শিক্ষা গ্রহনের পর এই মহিয়সী নারী অনগ্রসর পশ্চাৎপদ মেয়েদের শিক্ষিত করার দৃঢ় সংকল্পে উদ্বুদ্ধ হন। ১৯৬১ সালে নারায়নগঞ্জে মোট অংকের বেতনের চাকুরী ত্যাগ করে কক্সবাজারের একটি বেসরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে প্রথম কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর জয়দেবপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে (বর্তমানে গাজীপুর সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়) প্রধান শিক্ষিকার দ্বায়িত্ব গ্রহন করেন। নীতি নৈতিকতার প্রশ্নে আপোষহীন ব্যক্তিত্ব প্রতিভা মুৎসুদ্দি এখানে প্রশাসনিক অবৈধ হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে বেশিদিন টিকতে পারেননি। এরপর ১৯৬৩ সালে দানবীর রনদা প্রসাদ সাহা প্রতিষ্ঠিত টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের ভারতেশ্বরী হোমসের অর্থনীতির প্রভাষিকা হিসেবে যোগদান করেন। যদিও তিনি প্রথমে এখানে কাজ করার জন্যে আগ্রহী ছিলেন না। হোমসের এতিম অসহায় ছাত্রীদের কথা শুনে উদ্বুদ্ধ হন। অল্পসময়ের মধ্যেই তার কর্মের মাধ্যমে রনদা প্রসাদ সাহার আস্থাভাজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৬৫ সালে ভারতেশ্বরী হোমসের অধ্যক্ষার গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রতিভা মুৎসুদ্দির ক্লান্তিহীন পরিশ্রম ও বহু ত্যাগ তিতীক্ষার বিনিময়ে ভারতেশ্বরী হোমস ১৯৮৭ সালে স্কুল শাখা এবং ১৯৯৫ কলেজ শাখা দেশ সেরা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করে। দারবীর রনদা প্রসাদ সাহা প্রতিভা মুৎসুদ্দিকে মায়ের আসনে বসান। ১৯৭২ সাল থেকে তিনি কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের মির্জাপুর কুমুদিনী কমপ্লেক্স এর প্রশাসকের দায়িত্বপালন করে আসছেন। ১৯৯৮ সালে ভারতেশ্বরী হোমসের অধ্যক্ষার পদ থেকে অবসর গ্রহন করলেও আজও শিক্ষা বিস্তারে তার নিরন্তর প্রচেষ্টা চলমান। রণদা প্রসাদ সাহার প্রতিষ্ঠিত কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট অব বেঙ্গল (বাংলাদেশ) লিমিলেডের পরিচালক হিসেবে দীর্ঘদিন যাবত সুনামের সাথে কাজ করছেন। ট্রাষ্টের শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় রয়েছে কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজ, ভারতেশ্বরী হোমস স্কুল এন্ড কলেজ, কুমুদিনী নার্সিং স্কুল এন্ড কলেজ। যার কর্ণধার প্রতিভা মুৎসুদ্দি। এখানে শিক্ষা গ্রহণ করে অসংখ্য ছাত্রী দেশে বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কর্মরত ছিলেন এবং আছেন।
চিরকুমারী প্রতিভা মুৎসুদ্দি ছোটবেলা থেকেই স্বাধীনচেতা একজন মানুষ। নারী শিক্ষা তথা মানব কল্যানে তার কর্মে বিঘ্ন যাতে না ঘটে তার জন্য তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হননি। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন ভারতের স্থপতি অহিংস আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যুর পরথেকেই তিনি নিরামিষ ভোজী। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে রয়েছে প্রতিভা মুৎসুদ্দির গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহন রয়েছে। ১৯৫২ সালে চট্টগ্রাম জেলা ভাষা আন্দোলন পরিষদের হয়ে সরাসরি আন্দোলনে যোগদান করেন। এরপর ১৯৫৫ সালে ভাষা আন্দোলনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার দায়ে গ্রেফতার হন। ২ সপ্তাহ কারাভোগের পর মুক্তি পান। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে কুমুদিনীর মাধ্যমে নিজেকে ওতোপ্রতোভাবে নিয়োজিত করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার-ঔষধ প্রদানসহ স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা রাখেন। তার সহকর্মী খালেদা বেগমকে নিয়ে তাকে পোহাতে হয়েছে সাম্প্রদায়িকতার তিক্ততা। খালেদার কর্মজীবন ও বৈবাহিক জীবন প্রতিষ্ঠায় প্রতিভা মুৎসুদ্দির বিরল ভূমিকা তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায় অসাম্প্রদায়িকতার অন্যন্য দৃষ্টান্ত। প্রতিভা মুৎসুদ্দি কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ২০০২ সালে একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়া তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সদস্য ছিলেন। পেয়েছেন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সম্মাননা।
মির্জাপুরের প্রাক্তন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইশরাত সাদমীন বলেন, সততা ও নিষ্ঠার জীবন্ত প্রতিক প্রতিভা মুৎসুদ্দি। সবাই তাকে বড়মা বলে ডাকেন। প্রত্যেক নারীকে তার পদাংক অনূসরণ করা উচিত। গরিব, অবহেলিত এবং দলিত মেয়েদের শিক্ষিত করতে তার প্রচেষ্টা অতুলনীয়।
ভারতেশ্বরী হোমসের উপাধ্যক্ষ গোলাম কিবরিয়া বলেন, প্রতিভা মুৎসুদ্দি শিক্ষকের শিক্ষক। মহানুভবতা-বিরাটত্ব কি আমি ওনার নিকট থেকে অনূভব করেছি। ওনার সাথে কাজ করতে পেরে আমি গর্বিত। নারী শিক্ষা ক্ষেত্রে তার অবদান চির স্মরনীয় হয়ে থাকবে।
প্রতিভা মুৎসুদ্দি সম্পর্কে মির্জাপুরের সাবেক সংসদ সদস্য, টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান খান ফারুক টিনিউজকে বলেন, বিশ্ব-জগতে খুব কম মানুষের জন্ম হয় যারা জীবনে নিজের ভোগের কখনো কথা ভাবেননা। শুধু ত্যাগ ও কল্যাণই করেন। তেমনি সুমহান একজন ব্যক্তি মিস প্রতিভা মুৎসুদ্দি। প্রতিভা মুৎসুদ্দির ছাত্রীরা বলেছেন, তার কর্ম ও জীবন কাঠামো দ্বারা আলোকিত মানুষ হিসেবে তিনি বেঁচে থাকবেন চিরকাল। যা নারীদের অনূপ্রাণিত করবে।
কিংবদন্তী ভাষা সৈনিক প্রতিভা মুৎসুদ্দি টিনিউজকে বলেন, আমি বঙ্গবন্ধু ও রবি ঠাকুরের সোনার বাংলা দেখতে চাই। সুখী-শান্তিপূর্ণ, সাম্প্রদায়িকতামুক্ত, অন্যায়-অত্যাচার বিহীন সুষম সমাজ চাই। যেখানে নারীদেরকে ভাবতে হবে মানুষরূপে। ঘরের কোণে বসে না থেকে সমাজ ও জাতির উন্নয়নে তাদেরকে নিতে হবে সাহসী ভূমিকা।
বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রতিভা মুৎসুদ্দি টিনিউজকে আরো বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু নতুন নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন শিক্ষক শিক্ষিকা ও ছাত্রছাত্রীদের অসুবিধায় পড়তে হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষায় নকল, ক্রটিপূর্ণ ও তথ্যগত ভুল শিক্ষা ব্যবস্থায় আমাদের কাঙ্গিত অর্জন আজও আসেনি। এজন্য কর্তৃপক্ষকে অভিজ্ঞদের পরামর্শ-নির্দেশনা গ্রহনের পরামর্শ দেন। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, বই পড়ার মাধ্যমে পাশ করার মধ্যেই শুধু শিক্ষা নয়। প্রকৃত জ্ঞান অর্জন, সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চায় মনোনিবেশ করতে হবে। ১৯৭৪ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু যদি জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিতে পারেন তবে দেশে সর্বস্তরে কেন বাংলা ভাষা এখনো ব্যবহার হচ্ছে না।
প্রতিভা মুৎসুদ্দি বলেন, রণদা প্রসাদ সাহার বিশাল মানবসেবার যজ্ঞে আমি অংশীদার হয়ে নিজেকে সর্বদাই গর্বিত মনে করি। ভারতেশ্বরী হোমস যুগের সাথে সারাবিশ্বে লেখাপড়া জ্ঞান-বিজ্ঞানে শীর্ষে থাকবে এটাই আমার প্রত্যাশা। নারীরা সকল বাধা পেরিয়ে সত্যিকারের মানুষ হবে এটাই আমার চাওয়া। তিনি সমাজকে আমৃত্যু আলোকিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

ব্রেকিং নিউজঃ