বাসাইলে হয়নি স্কুলের নিবন্ধন॥ তবুও পাচ্ছে সরকারি পাঠ্যবই!

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥
নিবন্ধিত স্কুল ব্যতিত সরকারি পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ না পাওয়ার বিধান স্বত্তেও নিবন্ধনহীন স্কুল পাচ্ছে সরকারি পাঠ্যবই। একইভাবে শিক্ষা নীতিমালা কার্যক্রমের নিয়মানুসারে শিক্ষার্থী ভর্তিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণী ব্যতিত সকল শ্রেণীর ভর্তিতে ছাত্রপত্র গ্রহণের বিধান থাকলেও এই স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তিতে লাগছে না কোন ছাড়পত্র। এরপরও সম্প্রতি জারিকৃত সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় এর ২’শ গজের মধ্যে শুরু করা হয় ওই স্কুল কার্যক্রম। যদিও পরবর্তীতে উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বন্ধ হয়ে যায় ওই স্কুল কার্যক্রম। তবে এ সময় নিয়ম বর্হিভূত ও নিবন্ধনহীনভাবে স্কুল কার্যক্রম পরিচালনার অপরাধ স্বীকার করে আইনানুগ ব্যবস্থা থেকে বাঁচতে লোটাস ক্যাডেট স্কুল পরিচালক কোচিং সেন্টার পরিচালনার দাবি করাসহ কোন রূপ স্কুল কার্যক্রম পরিচালনা না করা শর্তে একটি মুচলেকা দেন।
নামমাত্র শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হলেও উপজেলা প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগের নাকের ডগায় এখনও রয়েছে নবনির্মিত লোটাস ক্যাডেট স্কুলের ক্যাম্পাস-২। ওই স্কুলে ভর্তিরত শিক্ষার্থীদের দিয়েই যথারীতি চলছে উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ রোডের একটি তৃতীয় তলা ভবনে দেদারসে চলছে লোটাস ক্যাডেট স্কুলের ক্যাম্পাস-১। এত অভিযোগ স্বত্তেও লোটাস ক্যাডেট স্কুল কার্যক্রম কেন বন্ধ হচ্ছে এ নিয়ে সর্বোচ্চ প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে উপজেলা প্রশাসন আর শিক্ষা বিভাগের দায়িত্বশীল ভূমিকা।
জানা যায়, বিগত ২০১৯ এর (২৪ জুলাই) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর পাশের যাতে নতুন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে না পারে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। এ আদেশ জারির ভিত্তিতে বিগত ২০১৯ সালে (৭ ডিসেম্বর) উদ্বোধন হওয়া বাসাইল সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় এর ২’শ গজের মধ্যে অবস্থিত নিবন্ধনহীন হয়েও পরিচালিত লোটাস ক্যাডেট স্কুল ক্যাম্পাস-২ এর স্কুল কার্যক্রম বন্ধ করে দেন উপজেলা প্রশাসন। এ সময় কোন রূপ স্কুল কার্যক্রম পরিচালনা না করা শর্তেও মুচলেকা দেন লোটাস ক্যাডেট স্কুল পরিচালক ও প্রধান শিক্ষক সফিকুল ইসলাম লোটাস।
সরেজমিন ও লোটাস ক্যাডেট স্কুলে ভর্তিরত অভিভাবক আর ছাত্রছাত্রীদের দেয়া তথ্যে জানা গেছে, এই স্কুলে শুধু ছবি আর জন্মনিবন্ধন দিয়েই ভর্তি হয়েছে শিক্ষার্থীরা। এছাড়াও সরকারি বইও সরবরাহ করেছেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। এই স্কুলের নামানুসারে রিসিপশনের মাসিক বেতন ৫’শ, এ্যালিমেন্টারী ওয়ান এর বেতন সাড়ে ৫’শ, এ্যালিমেন্টারী টু এর বেতন ৬’শ, স্টান্ডার্ড ওয়ান এর বেতন সাড়ে ৬’শ, স্টান্ডার্ড টু এর বেতন ৭’শ, স্টান্ডার্ড থ্রি এর বেতন সাড়ে ৭’শ, স্টান্ডার্ড ফোর এর বেতন ৮’শ, ৬ষ্ঠ শ্রেণীর বেতন ১২’শ সপ্তম শ্রেণীর বেতন ১৩’শ আর অস্টম শ্রেণীর বেতন নেয়া হচ্ছে ১৫’শ টাকা। এ সময় অভিভাবকদের আরো জানান, বর্তমানে লোটাস ক্যাডেট স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা প্রায় ২ শতাধিক।
লোটাস ক্যাডেট স্কুলে ছবি আর জন্মনিবন্ধন দিয়ে ভর্তি করার কথা স্বীকার করেছেন পঞ্চম শ্রেণীতে অধ্যায়নরত ইভা ও মাহিমের মা, চতুর্থ শ্রেণীতে অধ্যায়নরত জিহাদ সিদ্দিকী, রিহাদ এর মা আর রোশদার বাবা কবির মিয়া। এ সময় তারা ওই স্কুল থেকেই তাদের সন্তানদের বই দেয়ার কথাও স্বীকার করেছেন। এ সময় তারা জানান, ইতোপূর্বে তাদের সন্তানরা অন্য স্কুলে অধ্যায়নরত ছিল। তবে লোটাস ক্যাডেট স্কুলে তাদের সন্তানদের ভর্তি করলেও ছেড়ে আসা স্কুল থেকে তারা নেননি কোন ছাড়পত্র।
লোটাস ক্যাডেস স্কুল পরিচালক ও প্রধান শিক্ষক সফিকুল ইসলাম লোটাস টিনিউজকে জানান, গত বছরের (৭ ডিসেম্বর) তিনি শুরু করেন লোটাস ক্যাডেট স্কুলের কার্যক্রম। যদিও শিক্ষকতা পেশায় তার অভিজ্ঞতা ১৮ বছর। বেসরকারি বিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে কোন নিবন্ধন প্রয়োজন নেই। যদিও তার স্কুল কার্যক্রম ১ম শ্রেণী থেকে অস্টম শ্রেণী পর্যন্ত। তবে এখন চলছে ১ম থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত। এছাড়াও তার স্কুলে জেএসসি ও পিএসপি পরীক্ষা গ্রহণের নেই অনুমতি। যদিও তার স্কুলে ভর্তিরত শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্কুল থেকে ওই পরীক্ষাগুলো দিবে বলে জানান তিনি। এছাড়া ভর্তিতেও ছাত্রপত্র গ্রহণের কোন বিধান আছে কিনা তাও তার জানা নেই। এ সময় তিনি সরকারের জারিকৃত আদেশ মেনে ও স্কুল কার্যক্রম বন্ধ রেখে কোচিং সেন্টার পরিচালনার করার শর্তে মুচলেকা দেয়ার কথা স্বীকার করলেও তার স্কুল থেকে সরকারি পাঠ্যবই বিতরণের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। বন্ধ স্কুল ক্যাম্পাস-২ এর ছাত্র-ছাত্রীসহ তার শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় শতাধিক।
বাসাইল মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও তদন্ত কমিটির সদস্য মুহসিনুজ্জামান টিনিউজকে জানান, বাসাইল সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় এর ২’শ গজের মধ্যে লোটাস ক্যাডেট স্কুল ক্যাম্পাস-২ আর গ্রামীণ ব্যাংকের পিছনে অবস্থিত লোটাস ক্যাডেট স্কুল ক্যাম্পাস-১ নিবন্ধনহীনভাবে পরিচালিত স্কুলটিতে চলতি বছরের সরকারি পাঠ্যবই সরবরাহ করা হয়েছে এমন অভিযোগের তদন্ত করা হয়েছে। এ সময় শিক্ষার্থীদের কাছে বই পাওয়া গেলেও স্কুল কর্তৃপক্ষ ওই বইগুলো সরবরাহ না করার দাবি করলেও নিবন্ধন ছাড়া আর নিয়ম বর্হিভূতভাবে সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় এর ২’শ গজের মধ্যে নির্মিত লোটাস ক্যাডেট স্কুল ক্যাম্পাস-২ টি বন্ধ করে দেয়ার কথা স্বীকার করেন। এ সময় তিনি স্কুল ছুটির আগে ও পরে কোচিং সেন্টার পরিচালনার দাবি করাসহ নিবন্ধন ছাড়া ও নিয়ম বর্হিভূতভাবে স্কুল কার্যক্রম পরিচালনা না করা শর্ত মেনে মুচলেকা দেন। তবে তার দায়িত্বরত সরকারি স্কুলের পাশে এভাবে বেসরকারি স্কুল পরিচালনার ফলে বর্তমানে তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যতসামান্য ক্ষতিগ্রস্থ হলেও ভবিষ্যতে ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার শঙ্কার কথাও জানান তিনি।
এ বিষয়ে বাসাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামছুন নাহার স্বপ্না টিনিউজকে জানান, উপজেলা প্রশাসন থেকে লোটাস ক্যাডেট স্কুলে কোন বই সরবরাহ করা হয়নি। অন্য কোন মাধ্যমে গত বছরের বই তারা সংগ্রহ করে শিক্ষার্থীদের মাঝে সরবরাহ করেছেন। এছাড়াও নিয়ম বর্হিভূতভাবে বাসাইল সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় এর কাছে নির্মিত লোটাস ক্যাডেট স্কুল ক্যাম্পাস-২ টি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এ সময় স্কুল পরিচালনা না করে কোচিং পরিচালনা করার শর্তে দেয়া মুচলেকা অমান্য করেও গ্রামীণ ব্যাংকের পিছনে নির্মিত লোটাস ক্যাডেট স্কুল ক্যাম্পাস-১ নিবন্ধনহীনভাবে পরিচালনা করছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি টিনিউজকে বলেন, যেহেতু সরকারি নিয়ম বর্হিভূতভাবে বাসাইল সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে নির্মিত লোটাস ক্যাডেট স্কুল ক্যাম্পাস-২টি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সেহেতু অন্যত্র ওই স্কুলের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে কিনা সে বিষয়টি তাদের নয়। এছাড়াও ওই স্কুল পরিচালনাকে কেন্দ্র করে আদালতে মামলা হয়েছে, আদালতে মামলা চলাকালীন অবস্থায় এ বিষয়ে তাদের পক্ষে নতুন করে কোন কিছুই করার সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

ব্রেকিং নিউজঃ