বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল তুমি করেছো দান ॥ পরিবেশ মাতিয়েছে সৌন্দর্যে

শেয়ার করুন

রঞ্জিত রাজ ॥
‘বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছো দান, আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান…’। রবি ঠাকুরের শ্রাবণ সন্ধ্যায় গাওয়া গান আরো কাছে টানে বৃষ্টি আর কদম ফুলকে। যেন দু’জন দু’জনের চিরদিনের মিতা। তবে এদের সখ্য অনেক পুরনো। একজন আরেকজনের শুভেচ্ছাদূত। বর্ষা এলেই কদমের আনাগোনা, যার গন্ধ সুশোভিত করে তোলে দেহ-মন সারাক্ষণ। কদম ফুলের স্নিগ্ধ ছোঁয়ায় বৃষ্টি হয়ে উঠছে আরো বেশি কোমল। খাল-বিলে ভরাট পানিতে যেমন করে শাপলা সাজিয়ে তোলে, তেমনি চারপাশের পরিবেশকে মাতিয়ে এবং রঙিন করে দেয় কদম ফুল।
আষাঢ় ও শ্রাবণ বর্ষাকাল। পৃথিবীর আর কোনো দেশে ঋতু হিসেবে বর্ষার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বা নাম নেই। বর্ষা যেন শুধু বাঙালির ঋতু। কদম ফুলের স্নিগ্ধ ঘ্রাণ যুগে যুগে নগর কিংবা গ্রামবাসীকে মুগ্ধ করে এসেছে। তাই বর্ষা কবিদের ঋতু, রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের ঋতু। ‘বৃষ্টি ঝরুক আর নাই-বা ঝরে পড়ুক। বাদল দিনে প্রথম কদম ফুল ফুটুক আর নাই-বা ফুটুক, (১৫ জুন) দিনটি ছিল পহেলা আষাঢ়। ময়ূর পেখম মেলুক আর নাই-বা মেলুক, শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে কবিতার খাতা, ডায়েরির পাতা ভরে তোলার দিন।
মেঘের ভেলায় ভেসে কদম ফুলের ডালি সাজিয়ে নবযৌবনা বর্ষার সতেজ আগমন ঘটে এদিনে। বৃষ্টি শুষ্ক মাটির বুককে ভিজিয়ে সতেজ করে দেয় তৃষ্ণার্ত গাছপালাকে। বৃষ্টির শীতল স্পর্শ জুড়িয়ে দেয় তপ্ত হৃদয়। বৃষ্টির স্বচ্ছ পানি ভিজিয়ে দেয় আমাকে। আর আমি হাত বাড়িয়ে ছুঁয়েছি বৃষ্টিকে! কদম গাছগুলো সাদা-হলুদের মিশ্র রঙের ফুলে ছেয়ে গেছে। বর্ষা মানেই গুচ্ছ গুচ্ছ কদম ফুলের সুবাস। বর্ষা মানেই বৃষ্টির রিনিঝিনি কিংবা নূপুর-নিক্বণ ধ্বনি। বর্ষা ঋতু কাব্যময়, প্রেমময়। বর্ষা কবিতা-গানের ঋতু, আবেগের ঋতু, প্রিয়জনের সান্নিধ্য পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার ঋতু। তাই তো বর্ষায় প্রবল বর্ষণে, নির্জনে ভালোবাসার সাধ জাগে, চিত্তচাঞ্চল্য বেড়ে যায়, ব্যথিত-বঞ্চিত-নিঃসঙ্গ জীবন প্রেমসুধায় ভরিয়ে দেয়ার সাধ জাগে। শত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ভিড়েও কোথায় যেন মিলে একচিলতে বিশুদ্ধ সুখ! কদম ফুলের মতো তুলতুলে নরম, রঙিন স্বপ্ন দু’চোখের কোণায় ভেসে ওঠে ঠিক যেমন করে আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়। কদমের সুঘ্রাণে তৃপ্ত করতে ইচ্ছে হয় কোনো তৃষিত হূদয়।
গোধূলির পর অজস্র করুণার অমৃতধারার আবির্ভাব হয়। মেঘ-মাধুর্যে পরিপূর্ণ আকাশটাও সঙ্গীতের অপূর্ব সুর-মূর্ছনায় ঝঙ্কৃত হয় বৃষ্টি ঝরার তালে তালে। সেই রিনিঝিনি বৃষ্টির ধ্বনি মনের কিনারা ছুঁয়ে কী এক অজানা অনুভূতি স্বপ্ন জাগিয়ে তুলে! মনের আকাশটাও তাই মেঘ-মাধুর্যের সৌন্দর্যে কোমল ও সিক্ত হয়।
আষাঢ় ও শ্রাবণ এই দুই মাস বর্ষাকাল। বাঙালির প্রিয় ঋতুর একটি। আর এই বর্ষাতেই কদম ফুলের স্নিগ্ধ ঘ্রাণ যুগে যুগে শহর কিংবা গ্রামবাসীদের মুগ্ধ করে। বর্ষা এলেই কদম ফোটে, চোখ ধাঁধিয়ে দেয় ফুলপ্রেমিদের। খাল-বিলের উপচেপড়া পানি যেমন শাপলাকে সাজায়, তেমনি চারপাশের পরিবেশকে মাতিয়ে তোলে বর্ষার কদম ফুল। বর্ষা মানেই হলুদ-সাদা মিশ্র রঙের কদম ফুলে গাছ ছেয়ে যাওয়া। বর্ষা মানেই গুচ্ছ গুচ্ছ কদম ফুলের মিষ্টি সুবাস। কদম গাছের শাখায় পাতার আড়ালে ফুটে থাকা অজস্র কদম ফুলের সুগন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর এ কারণেই কদম ফুলকে বলা হয় বর্ষার দূত। কদম ফুলের আরেক নাম হল নীপ।
ফুলের সৌন্দর্যের মতো আরও কয়েকটি সুন্দর নাম রয়েছে- যেমন বৃত্তপুষ্প, সর্ষপ, ললনাপ্রিয়, সুরভি, মেঘাগমপ্রিয়, মঞ্জুকেশিনী, কর্ণপূরক, পুলকি, সিন্ধুপুষ্প ইত্যাদি। কদম বর্ণে, গন্ধে, সৌন্দর্যে এ দেশের ফুল গাছগুলোর মধ্যে অন্যতম। গাছের উচ্চতা ৪০ থেকে ৫০ ফুট। আদি নিবাস ভারতের উষ্ণ অঞ্চল, চীন ও মালয়ে। কদমগাছের পাতা লম্বা, উজ্জ্বল সবুজ ও চকচকে। বসন্তের শুরুতে গাছে নতুন পাতা গজায় এবং শীতে গাছের পাতা ঝরে যায়। কদম ফুল গোলাকার। পুরো ফুলটিকে একটি ফুল মনে হলেও এটি আসলে অসংখ্য ফুলের গুচ্ছ। এ ফুলের ভেতরে রয়েছে মাংসল পুষ্পাধার, যাতে হলুদ রঙের ফানেলের মতো পাপড়িগুলো আটকে থাকে। পাপড়ির মাথায় থাকে সাদা রঙের পরাগদণ্ড। ফল মাংসল, টক। এগুলো বাদুড় ও কাঠবিড়ালির প্রিয় খাদ্য।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ব্রেকিং নিউজঃ