ধনবাড়ীতে ধান গবেষণা প্রকল্পের ধানে ব্লাস্ট রোগ ॥ কৃষকরা দিশেহারা

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার, ধনবাড়ী ॥
টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে প্রান্তিক চাষীদের গ্রুপভিত্তিক ধান রোপন ও হার্ভেষ্টিংয়ের মাধ্যমে বাড়তি উৎপাদন প্রকল্পে ধানে ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত দেখা দিয়েছে। এতে করে সারা প্রকল্পের ধান চিটা হয়ে গেছে। কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে সিনক্রোনাইজড ফার্মিং প্রজেক্টের সফলতা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
জানা যায়, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সস্টিটিউট এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে প্রান্তিক চাষীদের নিয়ে খামার পদ্ধতিতে বোরো আবাদে ‘সিনক্রোনাইজড ফার্মিং প্রজেক্ট বা ‘সমকালিন খামার প্রকল্প’ গ্রহণ করে। ধনবাড়ী উপজেলার পাইস্কা ইউনিয়নের ভাতকুড়া গ্রামের ৫৪ জন চাষীর ৬০ বিঘা জমিতে চলতি বোরো মৌসুমে বোরো চাষের এ পরীক্ষামূলক প্রকল্প নেয়া হয়। ধান গবেষণা ইন্সস্টিউিটের ব্যতিক্রমধর্মী ফার্মিংয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো রাইসট্রান্সপ্লান্টার দিয়ে ধানের চারা রোপন এবং কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে ধান কর্তন। এতে জমির সদ্ব্যবহার হবে। উৎপাদন দ্বিগুণ হবে। কৃষকরাও আধুনিক কৃষিযন্ত্রপাতির সাথে পরিচিত হবেন। প্রকল্পভুক্ত কৃষকদের সার্বিকভাবে সহায়তার আশ্বাস দেয়া হলেও পরবর্তীতে তা সঠিকভাবে করা হয় নাই। যার ফলে প্রকল্পের ধানে ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে সমস্ত ধান চিটা হয়েছে। প্রকল্পে ব্লাস্ট রোগে আক্রমণসহ নানা অনিয়ম-অব্যস্থাপনায় সফল না হওয়ার সংশয় দেখা দিয়েছে। এতে স্থানীয় কৃষক পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকগণ হতাশায় ভুগছেন। রাগে ক্ষোভে ক্ষেতের ধান হারভেস্টার মেশিনে কাটতে দিতে রাজি হচ্ছেন না কৃষকরা।
গত জানুয়ারি মাসে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান, কৃষি সচিব নাছিরুজ্জামান, কৃষি সম্প্রসাধণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আব্দুল মুঈদ, ধান গবেষনা ইনস্টিটিটের মহাপরিচালক ড. শাহজাহান কবীর, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিটের মহাপরিচালক আবুল কালাম আযাদসহ কৃষি বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তার উপস্থিতিতে প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের কারিগরী সহযোগিতা ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে ওই প্রকল্পে ব্রি-৮৮, ব্রি-৮৯ (নতুন) ও ব্রি-২৯ জাতের ধানের আবাদ করা হয়েছিল। চাষাবাদে সংশ্লিষ্ট বিভাগের বীজ থেকে শুরু করে সার-কীটনাশক বিনামূল্যে দেয়ার কথা থাকলেও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। ধান কাটা নিয়েও উঠেছে অভিযোগ। যান্ত্রিক ত্রুটিপূর্ণ কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটার সময় এলোমেলো হয়ে মাড়াই কাজে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। তাই কম্বাইন হারভেস্টারে ধান কাটায় কৃষকের কোন উৎসাহ নেই। শ্রমিক দিয়ে কাঁচিতে ধান কেটে মাড়াই করার ব্যবস্থা নিচ্ছেন। মাড়াইয়ের পর ধানের পরিমাণ দেখে কৃষকের মাথায় হাত। তবে সংশ্লিষ্টরা তা স্বীকার করেনি।
প্রকল্পে ২৫ শতাংশ জমি ছিল ভাতকুড়া গ্রামের গুটু পাগলা নামের এক দরিদ্র কৃষকের। তার ছেলে চান মিয়া টিনিউজকে জানান, ক্ষেতে ঘাস আবাদ করলেও এমন প্রকল্পে আর কখনও ধান চাষ করবেন না। সামান্য জমিতে তাদের খাদ্যের সংস্থান হতো। প্রজেক্টে জমি দিয়ে সে পথ বন্ধ হলো। খাওয়া নিয়ে দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত চান মিয়ার অভিযোগ- প্রজেক্ট শুরুতে বলা হয়েছিল কোন টাকা লাগবে না। সার-কীটনাশক সব দিবে। ২৫ শতাংশ জমিতে ৭শ’ টাকা দিতে হয়েছে। কীটনাশক দেয়া হয়নি। সামান্য সার দিয়ে বাকি সার গোপনে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে।
অপর কৃষক ভাতকুড়া গ্রামের শফিকুল ইসলামের প্রকল্পে ২৪ শতক জমি। তার জমিতেও ধান মরে নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, আবাদের শুরুতে বলা হয়েছিল সব খরচ তারা দিবে। সেটা পুরোপুরি দেয়া হয়নি। সুবিধা-অসুবিধা দেখার জন্য দেলোয়ার, শফিক নামের উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা দায়িত্বে ছিলেন। তাদের ফোন করে ক্ষেতে আনা যায়নি। সার কিনে দিতে হয়েছে নিজেদের। তবুও ধান মরে নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু তার নয়, ৬০ বিঘার জমির প্রায় ৪০ বিঘার একই অবস্থা। কৃষক বেলাল অভিযোগ করে টিনিউজকে বলেন, কৃষি বিভাগের কথা বলে কৃষক সমিতির কয়েক নেতা কৃষকদের কাছ থেকে ৭২০ টাকা করে আদায় করেছেন। ধান চাষে এ প্রকল্প তার উপকার তো দূরের কথা উল্টো ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চিটা ধান কেটে আরও ক্ষতিতে না পড়তে তিনি ধান কাটতে আগ্রহ হারিয়েছেন। ক্ষেতেই তার আবাদের ধান গাছ দাঁড়িয়ে আছে। চাষ করা ধানে খাদ্যের যোগান এবার তো হচ্ছে না। স্থানীয় এমপি কৃষিমন্ত্রীকে ক্ষেতের অবস্থা দেখানোর প্রত্যয় নিয়ে তিনি বলেন, এটা নিশ্চিত জেনেই বলছি- ভিক্ষা করে খাব, তবুও মরা ধানের ক্ষেতের উপর দিয়ে মেশিন চালাতে দিব না। আগে আমার বুকের উপর দিয়ে চালাতে হবে। একই ধরনের অভিযোগ করেন চাষী কদ্দুছ আলী, টুক্কু মিয়া, শাহজাহান আলী, রেহানা বেগমসহ অনেকে। ধান মোটামুটি ভালো হয়েছে ভাতকুড়া গ্রামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কৃষক টিনিউজকে জানান, প্রকল্পে অনেক অনিয়ম হয়েছে। দেখভালে দায়িত্বশীলরা ছিলেন উদাসীন। সরকারিভাবে প্রকল্পের জমিগুলোর আবাদে সার-কীটনাশকসহ প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দেয়ার ঘোষণায় কৃষকরা আবাদে তেমন যত্নবান ছিলেন না। ফলে অবস্থা অনেকের খারাপ হয়েছে। তার ভালো হওয়ার রহস্য জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রকল্পের সাপোর্টে নির্ভর না করে অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছি। যখন যা দরকার হয়েছে নিজ পয়সায় কিনে ক্ষেতে দিয়েছি।
প্রজেক্টের বাইরে থাকা কৃষক ভাতকুড়া গ্রামের শফিকুল আলম টিনিউজকে জানান, প্রজেক্টে কৃষকরা লাভবান হননি। নানা অনিয়ম হওয়ায় বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তিনি নিজেও কৃষকদের জন্য বরাদ্দের সার সমিতির নেতৃস্থানীয় একজনের কাছ থেকে কিনে তার জমিতে দিয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন। প্রকল্পের আওতাভুক্ত কৃষক সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন টিনিউজকে জানান, স্থানীয় জমির মালিক ওয়াজেদ আলী খানের এক একর বর্গা জমিতে চাষ করে তিনি লাভবান হয়েছেন। নিজস্ব অর্থে কিনে ও ফ্রিতে সারসহ অন্যান্য সামগ্রি পেয়ে ক্ষেতে সময় মতো ব্যবহার করেছেন। অধিকাংশরাই তার মতো লাভবান হয়েছেন জানিয়ে তিনি টিনিউজকে বলেন, কেউ কেউ সময় মতো সেটা করতে না পেরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে যান্ত্রিক পদ্ধতির চাষে তিনি ধান কেটেছেন শ্রমিক দিয়ে কাঁচিতে। কারণ জানতে চাইলে তিনি টিনিউজকে জানান, কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনের যান্ত্রিক ত্রুটিতে খড় নষ্ট হচ্ছিল। তাই কাঁচিতে কাটা হয়েছে।
ধনবাড়ী কৃষি অফিসের উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন ও শফিকুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে টিনিউজকে জানান, পরামর্শ দেয়া সত্বেও কিছু-কিছু চাষী আক্রান্ত জমিতে সময় মতো বালাইনাশক প্রয়োগ না করায় ব্লাস্টরোগে ধান চিটা হয়ে গেছে।
ধনবাড়ী উপজেলা কৃষি অফিসার মাহবুবুর রহমান টিনিউজকে জানান, প্রকল্পটি আমাদের না। ধান গবেষণা ইন্সস্টিটিউটের। কাজেই প্রকল্পটি দেখভালের দায়িত্ব ধান গবেষনার। আমরা শুধু পরামর্শ দিয়েছি। পরামর্শ না শুনলে আমাদের কি করার আছে।
ধান গবেষণা ইন্সস্টিটিউটের কৃষি প্রকৌশলী এবং প্রকল্পের ট্যাগ অফিসার আশরাফ হোসেন টিনিউজকে জানান, প্রকল্পভূক্ত কৃষকরা সবাই বিনামূল্যে বীজ ও সার পেয়েছেন। তিন-চারজন অসচেতন কৃষক বাদে আর সবাই বিঘা প্রতি ২৪/২৫ মণ করে ধান পেয়েছেন। একটি স্বার্থান্বেষী মহল ব্লাস্ট রোগের জন্য অযথা কৃষিকর্মীদের দায়ী করছে। তারা করোনার অজুহাতে কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে মাঠে ধান কাটায় বাধাও সৃষ্টি করছেন।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

ব্রেকিং নিউজঃ