টাঙ্গাইল বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা গচ্চা

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥
বার বার মেয়াদ বৃদ্ধি করে দীর্ঘ ১০ বছরে বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার (নিউ ধলেশ্বরী-পুংলী-বংশাই-তুরাগ-বুড়িগঙ্গা রিভার সিস্টেম) প্রকল্পের কাজ হয়েছে খুব সামান্যই। এভাবে নদী খননের নামে সরকারের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এশিয়ান ড্রেজিং লিমিটেড। এই প্রকল্পে গত তিন বছর আগে ৯০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হলেও এই নদী খননের চিহ্ন নেই। পরে চলতি বছরে কালিহাতী অংশে নতুন করে ৫৪ কোটি ২৪ লাখ টাকার কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু এশিয়ান ড্রেজার একটি মাত্র শাকসন ড্রেজার ব্যবহার করছে। পাশাপাশি শতাধিক নিষিদ্ধ বাংলা ড্রেজার দিয়ে নদী খনন শুরু করেছে। তারা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ১৪.৫ কিলোমিটারের নদী খননের কাজ পেলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজসে সাব ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে অবাধে শতাধিক বাংলা ড্রেজার বসিয়ে বালু ও মাটি উত্তোলন করে বিক্রি করে চলেছে। এ কারণে স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলেছে এশিয়ান ড্রেজার লিমিটেড ছাড়া কেউ এই খনন কাজ করতে পারবে না।
টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, নদী খনন করে পানি প্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে বুড়িগঙ্গাকে দুষণমূক্ত করা, বুড়িগঙ্গা-তুরাগ রুটে সারা বছর নৌ-চলাচলের উপযোগী করাসহ সেচ ও মৎস্য উন্নয়নের জন্য নেয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২৯ দশমিক ৭ শতাংশ। ৯৪৪ কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে বিগত ২০১০ সালে প্রকল্পটি নেয়ার পর তিন দফা মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২০ সাল পর্যন্ত করা হয়। শেষ পর্যন্ত ডিজাইন বদলাতে হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বৃদ্ধি করা হচ্ছে। তবে ৩ বছরের এই প্রকল্প বাস্তবায়নে লাগতে পারে ১১ বছর। এছাড়া আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত ২০১০ সালের এপ্রিলে নেয়া প্রকল্পটি বিগত ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু দু’দফায় ব্যয় না বাড়িয়ে মেয়াদ বাড়ানো হয়। এতেও কাজ না হওয়ায় সর্বশেষ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধনের সময় ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ ঠিক করা হয়। এক্ষেত্রে মূল ডিপিপির তুলনায় ৬ বছর ৬ মাস বা ১৭৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ সময় বেশি লাগছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরাও ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর কথা বলছেন। নতুন করে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ১২৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।
সরেজমিন নদী খনন এলাকা কালিহাতী উপজেলার বেলুটিয়া গ্রামে নারায়নগঞ্জ থেকে দুইটি ড্রেজিং মেশিন আনা হয়েছে খননের জন্য। ড্রেজিং-এ নিয়োজিত আরিফুল ইসলাম জানান, দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে তিনিসহ ড্রেজিং-এর কাজে নিয়োজিত ২০জন রয়েছেন। এখানে স্থানীয় এলাকাবাসীর কারণে তারা আড়াই বছরের খনন কাজ শুরু করতে পারেননি। খনন করতে গেলেই স্থানীয় এলাকাবাসীর বাঁধার মুখে পড়তে হয়। তাই বাধ্য হয়েই তারা খনন কাজ বন্ধ রেখেছেন। আব্দুস সাত্তার খান জানান, গত তিন বছর বেলুটিয়া এলাকায় পানি প্রবাহের মূল উৎস মুখ খনন করা হয়। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে ভরাট হয়ে তা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এ কারণে এ কাজে নিয়োজিতরা আবার অন্য জায়গায় খনন করতে শুরু করে। এতে করে এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে তা বন্ধ করে দেয়। তাদের দাবি জমি অধিগ্রহণের টাকা না পাওয়া পর্যন্ত এ এলাকায় নদী খনন করতে দেয়া হবে না। মোজাম মন্ডল জানান, তার জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে ৫২ হাজার টাকা মূল্যে। তার ৬০ খতিয়ানের ২১৬ দাগের ও ২৭ দাগের ৮০ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি কোন জমির মূল্য পাননি। এ নিয়ে কয়েকবার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়ে কোন লাভ হয়নি। একই অভিযোগ দেলোয়ার হোসেনের। তিনি জানান, ২২৩ খতিয়ানের ৬৭০ দাগের ১১৯ শতাংশ জমি ৮৫ হাজার টাকা মূল্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তিনি শুনেছেন তার অধিগ্রহণের টাকা সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে এসেছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারেন লাখে ১০ হাজার টাকা দিলে তাকে জমি অধিগ্রহণের চেক দেয়া হবে। পরে তিনি চেক না নিয়ে ফিরে আসেন। এক অভিযোগ আব্দুল আওয়াল প্রামানিকের। তিনি জানান, ৪২ খতিয়ানের ১০৮ শতাংশ জমি ৬০ হাজার টাকা দরে অধিগ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু তার কাছে লাখে সাত হাজার টাকা দাবি করেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।
টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, নদী খননের কাজ টাঙ্গাইল অংশে দুইটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে। এর মধ্যে মির্জাপুর অংশে বংগজ ড্রেজিং লিমিটেড এবং কালিহাতী অংশে এশিয়ান ড্রেজিং লিমিটেড। তবে নীতিমালায় উল্লেখ্য আছে নদী খননের কাজে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজেরাই নদী খনন করবেন এবং এতে কোন প্রকার সাব ঠিকাদার বা নিষিদ্ধ বাংলা ড্রেজার ব্যবহার করা যাবে না। প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রম ছিল ভূমি অধিগ্রহণ, গাইড বাঁধ নির্মাণ, কায়িক পরিশ্রম ও ড্রেজারের মাধ্যমে নদী খনন, সেডিমেন্ট বেসিন নির্মাণ ও সংরক্ষণ কাজ, ব্রিজের ফাউন্ডেশন ট্রিটমেন্ট এবং পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং করা। এদিকে উপজেলার জোকারচর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, এশিয়ান ড্রেজিং লিমিটেড একটি মাত্র ড্রেজার মেশিন দিয়ে নদী খনন করছে। এ সময় ড্রেজিং-এর কাজে নিয়োজিত নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জানান, টাঙ্গাইলের কালিহাতী অংশে নদী খননের কাজ পেয়েছে এশিয়ান ড্রেজিং লিমিটেড। কিন্তু তারা ‘মা’ এন্টারপ্রাইজকে নদী খননের জন্য সাব ঠিকাদার নিয়োগ দিয়েছে। এতে করে সাব ঠিকাদাররা নদী খননের নামে শতাধিক বাংলা ড্রেজার বসিয়ে বালু ও মাটি উত্তোলন করে চলেছে। আর এসব উত্তোলনকৃত বালু ও মাটি বিক্রি করে চলেছেন। আবার ‘মা’ এন্টারপ্রাইজ সাব কন্ট্রাক নিয়ে তারা আবার এলাকার বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকে ২৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে নদী খননের কাজ দিয়েছে। এর মধ্যে উপজেলার বল্লববাড়ির বাছেদ ২৫০ মিটার, সরাতৈল গ্রামের জহরুল ইসলাম ৫০০ মিটার, চানমিয়া ও গুলজার ২৫০ মিটার, কুর্শাবেনু গ্রামের রফিক খান ৫০০ মিটারে বাংলা ড্রেজার বসিয়ে নদী খনন করছেন। এরপর চার কিলোমিটার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। আবার আনিস মিয়া ২০০ মিটার, নুরুল ইসলাম ৩০০ মিটার, পটল গ্রামের সোহেল মিয়া ৫০০ মিটার, এরপর ৫০০ মিটার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এরপর ইউপি সদস্য সুলতান ৫০০ মিটার, পরের ৫০০ মিটার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এরপর থেকে মশিউর ৫০০ মিটার, ইউপি চেয়ারম্যান আলিম ৫০০ মিটার, ইউপি সদস্য সোনা মিয়া ২৫০ মিটার, রাসেল ভূইয়া ৫০০ মিটার, এলেঙ্গা পৌর এলাকার লাভু মিয়া ৫০০ মিটার, বাশি গ্রামের জলিল মিয়া ৩০০ মিটার নদী খননের কাজ পেয়েছেন। নদী খননের কাজ পেয়েই তারা দীর্ঘদিন ধরে নদীতে নিষিদ্ধ বাংলা ড্রেজার বসিয়ে বালু ও মাটি উত্তোলন করে প্রতিদিন শতশত ট্রাক মাটি ও বালু বিক্রি করছেন।
এদিকে এভাবে নদী খননের নামে বাংলা ড্রেজার বসিয়ে বালু ও মাটি উত্তোলনের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে পুরো এলাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব প্রকল্পটি (নিউ ধলেশ্বরী-পুংলী-বংশাই-তুরাগ-বুড়িগঙ্গা রিভার সিস্টেম) এভাবে নিয়মবহির্ভুতভাবে নদী খনন করলে নদীর পারের মানুষ আরো হুমকির মুখে পড়বে। আর এ কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন যেখানে বালু দেখে সেখানেই নদী খনন শুরু করে। জোকারচর গ্রামের শেখ আবুল হাশেম জানান, এখানে নদী খনন হচ্ছে নাতো সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় করছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। যেভাবে বাংলা ড্রেজার দিয়ে নদী খনন করা হচ্ছে এটা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সব জেনেও না জানার ভান করেন। আমরা কিছু বললেই স্থানীয় সরকার দলীয় ক্যাডার বাহিনী দিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হয়। এ কারণে স্থানীয় লোকজন কিছু বলতে সাহস পায় না।
কালিহাতী উপজেলার সহকারি কমিশনার (ভূমি) শাহরিয়ার রহমান জানান, প্রকল্পটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের। এ কারণে এসব কিছু তদারকির দায়িত্বও তাদের। আর বাংলা ড্রেজারের বিষয় নিয়ে আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ করলে তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কেউ অভিযোগ করেনি।
টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম জানান, খনন কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এশিয়ান ড্রেজিং লিমিটেড কোন ভাবেই সাব ঠিকাদার দিয়ে নদী খনন করতে পারবে না। তারা যদি সাব ঠিকাদার দিয়ে নদী খনন কাজ করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে বাংলা ড্রেজার বসিয়ে নদী খননের বিষয়টি জানেন না তিনি। মির্জাপুর অংশে ২১ কোটি ৯১ লাখ টাকা এবং কালিহাতী অংশে এশিয়ান ড্রেজিং লিমিটেড কাজ করছে ৫৪ কোটি ২৪ লাখ টাকার। এর আগে ১৪টি প্যাকেজের কাজে ৯০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
সাব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মা’ এন্টারপ্রাইজের সত্ত্বাধিকারি সুজন খান জানান, এশিয়ান ড্রেজিং লিমিটেডের একজন প্রতিনিধি বাসাইল উপজেলার বাদল মিয়ার সাথে তার ব্যবসায়ীক একটি সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণে বাদল মিয়া তাকে জানিয়েছেন আপনার প্রতিষ্ঠান ‘মা’ এন্টারপ্রাইজকে সাব ঠিকাদার দিয়ে নদী খননে সহযোহিতা করতে হবে। তবে এ খনন কাজে সাব ঠিকাদার দেয়া যাবে কিনা এ বিষয়ে তার জানা নেই।
এশিয়ান ড্রেজিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামীম রেজার ব্যবহৃত মুঠোফোনে (০১৭১১৫৪০৩০৬) বারবার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেননি।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

ব্রেকিং নিউজঃ