টাঙ্গাইলে শিশুসহ অন্তসত্তা মা’কে জবাই ও কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥
অনাগত ছেলে সন্তান নিয়ে অনেক স্বপ্ন বুনছিলেন পিতা আলামিন। চার বছরের শিশু মেয়ের পর ছেলে আসছে পৃথিবীতে। এ কারণে খুশি আর আনন্দে পুরো পরিবার ছিল আত্মহারা। স্ত্রীর যত্ন নিচ্ছিলেন ভালভাবে। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পৃথিবীতে সন্তানের আলো দেখার দিনও নির্ধারণ করেছিলেন ডাক্তার। আনন্দে আত্মহারা বাবা তার ছেলের জন্য বেশ কিছু খেলনাও কিনে রেখেছিলেন। কিন্তু সব স্বপ্ন যেন নিমিষেই বিষাদে পরিণত হলো। স্বপ্নেও ভাবেননি তার জীবনে এমন কিছু অপেক্ষা করছে। মুহুর্তেই সব কিছু তছনছ হয়ে গেল। দুর্বৃত্তরা তার সাড়ে ৮ মাসের অন্তঃসত্তা স্ত্রী লাকী আক্তার ও চার বছরের শিশু মেয়ে হোমাইরা আক্তার আলিফাকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও জবাই করে হত্যা করেছে। দুর্বৃত্তরা অনাগত পেটের সন্তানকেও পৈশাচিকভাবে কুপিয়েছে।
শনিবার (১২ অক্টোবর) রাত ১২টার দিকে টাঙ্গাইল পৌর শহরের ভাল্লুককান্দী এলাকায় এই নিশংস ঘটনা ঘটেছে। রাতেই পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে। হত্যার পর দুর্বৃত্তরা বাড়িতে রাখা বিকাশের ৮ লাখ টাকাও নিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন নিহতের স্বামী আলামিন। এদিকে রোববার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে নিহত লাকী আক্তারের পিতা হাসমত বাদি হয়ে টাঙ্গাইল সদর মডেল থানায় অজ্ঞাত আসামী করে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
নিহতের স্বামী আলামিন টিনিউজকে জানান, তিনি বিভিন্ন মোবাইল কোম্পানীর ফ্লেক্সিলোড ও বিকাশের ব্যবসা করেন। ভাল্লুককান্দি এয়ারপোর্ট রোডে আসাদ মার্কেটে তার দোকান। দোকান থেকে তার বাসায় যেতে পায়ে হেটে প্রায় পাঁচ মিনিট সময় লাগে। বাসার একশ’ গজের মধ্যে কোন বাড়ি নেই। শুধু আলামিনের একটিই বাড়ি। বাড়িতে শুধু আলামিনের স্ত্রী ও মেয়ে আলিফা থাকতো। একটি টিনের ঘর ও ছোট্ট একটি রান্নাঘর। বাড়ির সামনে ডোবা। ছোট্ট একটি রাস্তা দিয়ে ওই বাড়িতে যেতে হয়। রাস্তাটি অন্ধকার থাকার কারণে প্রতিদিন রাতে দোকান বন্ধ করে আলামিন তার স্ত্রীকে মোবাইলে কল দিয়ে বলতো, তারপর স্ত্রী লাইট নিয়ে এগিয়ে আসতো। প্রতিদিনের ন্যায় শনিবার (১২ অক্টোবর) রাত ১২টার দিকে দোকান বন্ধ করে আলামিন তার স্ত্রীকে ফোন দেয়। কিন্তু ১০/১২ বার ফোন দিলেও স্ত্রী ফোন ধরেনি। হয়ত ব্যস্ত রয়েছে এমন চিন্তায় সে বাড়িতে চলে আসে। দেখে বাড়ির মুল গেট খোলা। ঢুকেই উঠানে দেখে তার স্ত্রী ও কন্যার বিভৎস লাশ পড়ে রয়েছে। দেখেই সে চিৎকার করে। পরে আশপাশের লোক এসে ভীর করে।
রোববার (১৩ অক্টোবর) সকালে আলামিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় ঘরে তালা দেয়া। এলাকার শত শত উৎসুক জনতা ওই বাড়িতে ভীর করছে। পুলিশ ও র‌্যাবের বিভিন্ন ইউনিট এসে আলামত সংগ্রহ করছে। বাড়ির উঠানে যেখানে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, সেখানে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ রয়েছে। পুলিশ চারদিক ঘিরে রেখেছে। কিছু দূরেই নিহত লাকীর মামা ফেরদৌস হিরার বাড়ি। ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে আলামিন বার বার জ্ঞান হারাচ্ছেন। জ্ঞান ফিরলেই চিৎকার করে উঠছেন। অনাগত সন্তানসহ যারা তার স্ত্রী ও মেয়েকে হত্যা করেছে তাদের খুঁজে বের করে বার বার ফাঁসির দাবি জানান।
নিহতের চাচা শশুর রওশন আলী টিনিউজকে বলেন, তার ভাতিজা আলামিন প্রায় ১০/১২ বছর ধরে ফ্লেক্সিলোড ও বিকাশের ব্যবসা করেন। প্রায় দুই বছর আগে এখনে জমি কিনে বাড়ি করেছেন। তার স্ত্রী খুবই ভাল ছিল। কি কারণে এই ধরণের নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটল। তিনি এই হত্যাকারীদের দ্রুত খুঁজে বের করার দাবী জানান।
নিহত লাকির মামা ফেরদৌস হিরা কান্নাজড়িত কন্ঠে টিনিউজকে বলেন, পরিচিত লোকজনই এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। বাড়িতে টাকা রয়েছে যারা জানতো তারাই এই কাজ করেছে। আমার ভাগ্নি অত্যন্ত ভাল ছিল। আলামিনের সাথে আমিই বিয়ে দিয়েছিলাম। পেটের সন্তানসহ তিনজনকে এভাবে হত্যার শিকার হতে হবে স্বপ্নেও ভাবিনি। তিনি হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দাবি করেন।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মোশাররফ হোসেন টিনিউজকে জানান, রাতে কে বা কারা তাদের বাড়িতে ঢুকে মা ও মেয়েকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছে লাশ উদ্ধার করে। পরে রোববার সকালে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। ইতিমধ্যে পুলিশ হত্যাকারীদের খুঁজতে মাঠে নেমেছে। আমরা পারিবারিক পুর্বশত্রুতা, ব্যবসায়ীক সমস্যা অথবা অন্য কোন কারণে এই হত্যাকান্ড ঘটেছে কিনা, সব কিছু মাথায় নিয়েই তদন্ত করছি।
এদিকে হত্যাকান্ডের খবর পেয়ে রোববার (১৩ অক্টোবর) সকালে পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায়, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সফিকুল ইসলাম (ডিএসবি), অতিক্তি পুলিশ সুপার রেজাউর রহমান (সদর সার্কেল), অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বেলাল হোসেন (পিবিআই), র‌্যাবের ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার সহকারি পুলিশ সুপার শফিকুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
এই হত্যাকান্ডের ব্যাপারে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায় টিনিউজকে বলেন, রোববার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে নিহত লাকি বেগমের পিতা হাসমত আলী বাদি হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামী করে টাঙ্গাইল সদর মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। নৃশংস ও বর্বর এই হত্যাকান্ডের প্রকৃত হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে ইতিমধ্যে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ, পিবিআই ও সদর থানা পুলিশের সকল ইউনিট কাজ করছে। ঘটনাস্থল থেকে সকল আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। আশা করছি খুব দ্রুতই এই হত্যাকান্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করে আসামীদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হবো।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

ব্রেকিং নিউজঃ