Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!

টাঙ্গাইলে বাড়ছে কিশোর অপরাধ ॥ খুন, ধর্ষন, মাদকের ব্যবহার

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইলে কিছু কিছু কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আর এতে বাড়ছে কিশোর অপরাধের ঘটনা। স্কুল কিংবা কলেজের গ-ি পেরোনোর আগেই অনেকে জড়িয়ে পড়ছে অপরাধীচক্রের সঙ্গে। তারা দল বাঁধছে এবং এক দল অন্য দলের সঙ্গেও দ্বন্দ্বে জড়াচ্ছে। খুনের মতো ঘটাচ্ছে ভয়ংকর সব অপরাধ। আবার এক দল মাদকের নেশায় পড়ে যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ পার্টি করা, হর্ন বাজিয়ে প্রচন্ড গতিতে মোটরসাইকেল, আড্ডা মারা, বিভিন্ন মার্কেটে অবস্থান নেয়া ও প্রাইভেটকার চালানো এবং বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করছে।
বিশেষ করে ১৩ থেকে ১৪ এবং ১৬ থেকে ১৭ বছরের কিশোররা এসব অপরাধ করছে। তবে কোনো নাম দিয়ে গ্যাং পরিচালনা না করলেও তারা সংঘবদ্ধভাবে সক্রিয় হয়ে এসব কর্মকান্ড করছে। আর এতে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছেন পরিবারের লোকজন। পুলিশ বলছে, কিশোর অপরাধ যাতে না বাড়ে সেজন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। শহরবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তারা এসব কিশোর বখাটের উৎপাত দেখে আসছেন। তাদের উচ্চগতির মোটরসাইকেলের রেস পথচারীদের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব কিশোর অপরাধী ‘গ্যাংয়ের’ ব্যাপারে অভিভাবক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেকটা উদাসীন।
জানা যায়, এসব কিশোররা মূলত পার্টি বা ফুর্তির আয়োজন করে। হর্ন বাজিয়ে প্রচন্ড গতিতে মোটরসাইকেল চালানো, আড্ডা মারা, বিভিন্ন মার্কেটে অবস্থান নেয়া এবং মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে দাপট দেখায়। এই কিশোরদের বয়স ১৪ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। এদের বেশির ভাগ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান ও স্কুলছাত্র। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারেরও লেখাপড়া না করা বখাটে ছেলে এসব কিশোর সাথে সংঘবদ্ধ হচ্ছে। এলাকার বড় ও মুরুব্বিদেরও এরা সম্মান করে না।
মেজর জেনারেল মাহমুদুল হাসান আদর্শ মহাবিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র টিনিউজকে বলেন, কখনো একটি দলের পাল্লা ভারি থাকে। যে দলের পাল্লা ভারি থাকে সেই দলের কিশোর সদস্যরা তখন বড় ভাই। তারাই খেলার মাঠের নিয়ন্ত্রণ, মোটরসাইকেল রেস ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণসহ সবকিছুতেই মাতাবরি করে। রাস্তায় রোমিওগিরি করে। তখন আরেক দল ‘নিয়ন্ত্রণ’ নেয়ার চেষ্টা করে। এ থেকে মারামারি হয়। সম্প্রতি শহরের আদালতপাড়ার একদল কিশোর সন্ধ্যার পর পার্শ্ববর্তী এলাকা মিরের বেতকায় গিয়ে একটি দোকানের সামনে মদ পান করতে থাকে। এ সময় ওই এলাকার লোকজন এতে বাধা দেন এবং কিশোরদের চলে যেতে বলেন। এ কথা শুনে কিশোররা চলে আসার কিছুক্ষণ পর আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে পুনরায় সেখানে গিয়ে বাধা দেয়া লোকজনের ওপর হামলা চালায়। এ সময় চারজনকে কুপিয়ে আহত করে তারা। পরে আহতদের উদ্ধার করে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর আগে দুই গ্রামের যুবকদের মধ্যে সংঘর্ষের জের ধরে রাতে সদর উপজেলার পোড়াবাড়ী ইউনিয়নের রক্ষিতবেলতা গ্রামে তিন বছরের মেয়ের সামনেই মা রোজিনা বেগমকে গলা কেটে হত্যা করে একদল কিশোর। টাঙ্গাইলে সংঘবদ্ধ কিশোররা মারামারি-কাটাকাটিতেই নয়- ধর্ষণ, মাদক ব্যবসা ও সেবনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত।
সম্প্রতি এক রাতে টাঙ্গাইল নতুন বাসস্ট্যান্ডে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন এক দম্পতি। এ সময় কয়েকজন বখাটে কিশোর ওই দম্পতিকে ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বামীকে মারধর করে স্ত্রীকে উঠিয়ে নিয়ে সারা রাত ধর্ষণ করে। এরপর ওই দিন রাত সাড়ে ৩ টার দিকে পৌর এলাকার সাবালিয়া চোরজানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দা থেকে ওই গৃহবধূকে উদ্ধার করে পুলিশ। পরে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে পুলিশ কোদালিয়া এলাকার আলম মিয়ার ছেলে ইউসুফ রানা, আবদুর রশীদের ছেলে মো. রবিন, রবিকুল ইসলামের ছেলে তানজীরুল ইসলাম তাছিন, তালতলা মোড় এলাকার মৃত মজনু মিয়ার ছেলে মো. মফিজ, একই এলাকার আল বিরুনীর ছেলে ইব্রাহিম ও দেওলা গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে জাহিদুল ইসলামকে গ্রেফতার করে। পরে গ্রেফতার কিশোররা ধর্ষণের বিষয়টি স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়। এছাড়া মধুপুরে বাড়িতে একা পেয়ে শতবর্ষী এক বৃদ্ধাকে ১৫ বছরের সোহেল নামের এক কিশোর ধর্ষণ করে। পরে এ ঘটনায় ওই বৃদ্ধার ছেলে বাদী হয়ে মধুপুর থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ রাতেই অভিযান চালিয়ে ধর্ষক সোহেলকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার সোহেল ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়।
সন্তানদের খোঁজখবর না রাখা এবং অসুস্থ রাজনীতির কারণে এসব কিশোর ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। এরা টাকার লোভে ছিনতাইসহ বন্ধুকেও হত্যা করতে পিছপা হচ্ছে না। এরই ধারাবাহিকতায় এক লাখ টাকার লোভে নিজের বন্ধুকে হত্যা করার ঘটনাও ঘটেছে। সদর উপজেলার মগড়া ইউনিয়নের বাহিরশিমুল গ্রামের নানার বাড়ি থেকে মোটরসাইকেলে করে বের হওয়ার পর থেকেই নিখোঁজ হয় সজীব মিয়া। এ বিষয়ে টাঙ্গাইল মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল। এছাড়া কালিহাতী উপজেলার হাতিয়া এলাকায় গলায় রশি ও মুখে স্কচটেপ পেঁচানো অবস্থায় সজীবের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার সঙ্গে পুলিশ কনস্টেবল মোশারফ হোসেন হৃদয় ও নিহত সজীবের বন্ধু সজীবের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। তারা দু’জনই গ্রেফতারের পর এ হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে।
এদিকে উঠতি বয়সের এসব কিশোর মাদক সেবনেও পারদর্শী। তারা সারাক্ষণ বুঁদ হয়ে থাকছে নেশার ঘোরে। হয়ে উঠছে অসহিষ্ণু। ঠুনকো ঘটনাকে কেন্দ্র করে তারা জড়িয়ে পড়ছে বড় সহিংসতায়। পাড়া-মহল্লায় দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো, স্কুল-কলেজের সামনে আড্ডা, মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া, শহরের মার্কেটগুলোতে অবস্থান, তরুণীদের উত্ত্যক্ত করা, দল বেঁধে মাদক সেবন, একই স্টাইলে চুল কাটাসহ বিভিন্ন অপকর্ম করতে গড়ে তুলছে এসব কিশোররা। দিন দিন তারা হয়ে উঠছে ভয়ঙ্কর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটারে এসব গ্রুপ গড়ে উঠছে হরদম। এক গ্রুপের দেখাদেখি জন্ম নিচ্ছে আরেক গ্রুপ। প্রতিটি গ্রুপের কাছে রয়েছে ধারালো অস্ত্র। এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে প্রতিপক্ষ ভাবলে ঘটছে খুনোখুনির ঘটনা। সিনিয়র-জুনিয়র বা নারীঘটিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটছে হত্যাকান্ড। এমন অপরাধ শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে।
জেলার র‌্যাব ও পুলিশ কর্মকর্তারা টিনিউজকে বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের প্রতিটি ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পরিবারের উদাসীনতায় তারা কোনো না কোনোভাবে বখে গেছে। তারা কোনো না কোনো ধরনের মাদকে আসক্ত। গ্যাং কালচারে শিক্ষিত ও অল্পশিক্ষিত দুই শ্রেণির কিশোর আসক্ত। তাদের ভিতর নিজেদের জাহির করার একটা প্রবণতা কাজ করে।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায় টিনিউজকে জানান, ইতিমধ্যে কিশোর অপরাধে জড়িত থাকায় বেশকয়েকজনকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে টাঙ্গাইলে যেন আর কিশোর অপরাধ না বাড়ে এজন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

ব্রেকিং নিউজঃ