Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!

টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে গর্জে উঠেন দুঃসাহসিক মুক্তিযোদ্ধারা

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥
আবদুল কাদের সিদ্দিকী ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে টাঙ্গাইলে গঠিত বিশেষ সশস্ত্র বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হন। দেশমাতৃকার মুক্তিসংগ্রামে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রতিরোধের জন্য টাঙ্গাইল অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল কাদেরিয়া বাহিনী। পাকিস্তানি সেনারা একাত্তরে বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি এমন অঞ্চলগুলোর অন্যতম টাঙ্গাইল।
এ বাহিনীর নেতৃত্বে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ছাড়াও ছিলেন আনোয়ার-উল-আলম শহীদ, এনায়েত করিমসহ অনেকে। প্রাথমিক পর্যায়ে টাঙ্গাইলে তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধ করেন। টাঙ্গাইলের প্রতিরোধযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে পুরো বাহিনী টাঙ্গাইলের প্রত্যন্ত এলাকা সখীপুরে চলে যান। সেখানে শুরু হয় এ বাহিনীর পুনর্গঠন-প্রক্রিয়া এবং রিক্রুট ও প্রশিক্ষণ। পরবর্তীকালে এ বাহিনীরই নাম হয় ‘কাদেরিয়া বাহিনী’। মুক্তিযুদ্ধকালে আবদুল কাদের সিদ্দিকী দক্ষতা এবং সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা টাঙ্গাইলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি অসংখ্য যুদ্ধ ও অ্যাম্বুশ করেন। এর মধ্যে ধলাপাড়ার অ্যাম্বুশ অন্যতম।
টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার অন্তর্গত ধলাপাড়ায় ১৬ আগস্ট আবদুল কাদের সিদ্দিকী ধলাপাড়ার কাছাকাছি একটি স্থানে ছিলেন। তিনি খবর পান, তাদের তিনটি উপদল পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঘেরাও করেছে। তাদের সাহায্য করার জন্য তিনি সেখানে রওনা হন। আবদুল কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন ১০ জন। এই ১০জন সহযোদ্ধা নিয়ে পাকিস্তানিরা যে পথ দিয়ে পিছু হটছিল, সে পথে অবস্থান নেন তিনি। পাকিস্তানি সেনারা সংখ্যায় ছিল অনেক বেশি। তবে বিচলিত না হয়ে নিজের দুর্ধর্ষ প্রকৃতির সহযোদ্ধাদের নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। ১টা বেজে ২০ মিনিটে পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের অ্যাম্বুশে প্রবেশ করে এবং চল্লিশ গজের মধ্যে আসা মাত্র কাদের সিদ্দিকী এলএমজি দিয়ে প্রথম গুলি শুরু করেন। একই সময় তার সহযোদ্ধাদের অস্ত্রও গর্জে ওঠে। নিমেষে সামনের কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। বাকি সেনারা প্রতিরোধে না গিয়ে পালিয়ে যেতে থাকে। এ দৃশ্য দেখে কাদের সিদ্দিকী উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে এলএমজি দিয়ে পলায়নরত পাকিস্তানি সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি করতে থাকেন। তার সহযোদ্ধারাও উঠে দাঁড়িয়ে গুলি শুরু করেন। এ সময় হঠাৎ পাকিস্তানি সেনাদের ছোড়া গুলি ছুটে আসে আবদুল কাদের সিদ্দিকীর দিকে। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন তিনি। তারপরও তিনি দমে যাননি। আহত অবস্থায় যুদ্ধ চালিয়ে যান। যুদ্ধ শেষে সহযোদ্ধারা তাকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। সেদিন তাঁদের হাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রায় ৪০ জন হতাহত হয়।
বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন একাত্তরের দুঃসাহসিক কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর-উত্তম। তিনি তার মুক্তিযোদ্ধা সহকর্মীদের নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার প্রতিবাদে সশস্ত্র লড়াইয়ে নামেন। তিনি তখন জেলা গভর্নর। ২২ আগস্ট ছয়জন সঙ্গী নিয়ে জামালপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতে ঢোকেন তিনি। সেখানে গিয়ে ‘হত্যাকারী অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে’ সশস্ত্র প্রতিরোধের ডাক দেন। টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা এবং ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মী ভারতে গিয়ে যোগ দেন কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকেও অনেকে যান।
১৯৭৫ সালের অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে এই বাহিনীর একটি গ্রুপ যমুনা নদী হয়ে নৌপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর চরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তাঁদের সম্মুখযুদ্ধ হয়। এতে বগুড়া জেলা যুবলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেক খসরু নিহত হন। পরে তারা সেখান থেকে পিছু হটে টাঙ্গাইল হয়ে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত এলাকায় চলে যান। পথে হালুয়াঘাটে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ হয়। হালুয়াঘাট সীমান্তে গিয়ে গোবড়াকুড়া গ্রামে আদিবাসী গারো প্রবোধ দিওর বাড়িতে প্রতিরোধব্যূহ (ডিফেন্স) তৈরি করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে গ্রুপটি।
বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ভারতের তিন মাইল ভেতরে চান্দুভূই নামকস্থানে প্রতিরোধযোদ্ধাদের হেডকোয়ার্টার স্থাপন করা হয়। বাহিনীর নামকরণ করা হয় ‘জাতীয় মুক্তিবাহিনী’। এ বাহিনীর লোগো ও ব্যাজে ব্যবহার করা হয় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি। বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ নির্বাচিত হন কাদের সিদ্দিকী। এছাড়া ৩৬ জনকে এই বাহিনীর কমান্ডার করা হয়। ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধুর প্রথম মৃত্যুার্ষিকীতে প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে জাতীয় মুক্তিবাহিনী ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করে। বাহিনীর পক্ষ থেকে ১৫ আগস্টকে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করে অনেকগুলো সশস্ত্র গ্রুপকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অ্যাকশনে পাঠানো হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব গ্রুপের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যুদ্ধ হয়। এতে জাতীয় মুক্তিবাহিনীর বেশ কয়েকজন নিহত, আহত ও গ্রেপ্তার হন। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় বিশ্বজিৎ নন্দীর নেতৃত্বে একটি গ্রুপ টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কে বানারপাড়া সেতু আক্রমণ করে। পরদিন তাদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে চারজন শহীদ হন। গুলিবিদ্ধ হয়ে বিশ্বজিৎ নন্দী গ্রেপ্তার হন। সামরিক আদালতে তার ফাঁসির আদেশ হয়। ১৪ বছর কনডেম সেলে কাটিয়ে নব্বই সালে মুক্তি পান তিনি। কাদের সিদ্দিকীর বাহিনীর তৎপরতা আতঙ্ক ছড়ায় ক্ষমতাসীনদের মধ্যে। গোয়েন্দা নজরদারি, গ্রেপ্তার বেড়ে যায়। বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তী প্রথম বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বরে কাদেরিয়া বাহিনী ঢাকায় অভিযান চালাতে পারেন, এ আশঙ্কায় ব্যাপক সতর্কতা অবলম্বন করে সরকার।
১৯৭৭ সালে ভারতের নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস হেরে যায়। ক্ষমতায় আসেন মোরারজি দেশাই। নতুন সরকার জাতীয় মুক্তিবাহিনীকে তাদের দেশের মাটি ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। জাতীয় মুক্তিবাহিনীর প্রধান কাদের সিদ্দিকীকে আলোচনার কথা বলে মেঘালয়ের তুরায় নিয়ে গিয়ে নজরবন্দি করা হয়। বাহিনীর অন্য সদস্যদের চান্দুভূই হেডকোয়ার্টারে বিএসএফ সদস্যরা ঘিরে রাখে। একপর্যায়ে সাতাত্তরের মে মাসে প্রতিরোধযোদ্ধাদের বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বাহিনী প্রধান কাদের সিদ্দিকীসহ নেতৃস্থানীয় কয়েকজন নেতাকে আশ্রয় দেয় ভারত সরকার। আর এর মধ্য দিয়েই সমাপ্তি ঘটে এ লড়াইয়ের। ইতিহাসের জঘন্যতম এই হত্যাকা-ের পরপর শুরু হওয়া সেই সশস্ত্র যুদ্ধ চলেছে ১৯৭৫ সালের মে মাস পর্যন্ত। প্রায় দুই বছর ধরে চলা এই প্রতিবাদ সংগ্রামে শহীদ হন শতাধিক। পঙগুত্ব বরণ করেন শত শত জন। প্রায় ছয় হাজার জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়। তারা অবর্ণনীয় নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হন।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা এ আন্দোলনে ছিল অন্যতম প্রধান শক্তি। যোদ্ধাদের ৩০ শতাংশই ছিল তারা। শহীদ যে ৮৬ জনের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে, এর মধ্যে ২৫ জনই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে গড়ে ওঠা সশস্ত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও সমর্থন জানানোর অপরাধে সাধারণ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের সে সময় অনেক নির্যাতন, হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। অনেকে দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর থানার মাটিকাটার যুদ্ধ কাদেরিয়া বাহিনীর সবচেয়ে বড় ও সফল যুদ্ধ। ‘জাহাজমারা’ যুদ্ধ নামে এর খ্যাতি রয়েছে। এই যুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অবিস্মরণীয় সাফল্যের ঘটনা। এটি ছিল মূলত হানাদারদের অস্ত্রবাহী জাহাজবহরের ওপর কাদেরিয়া বাহিনীর অভিযান। ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের উদ্দেশে হানাদার বাহিনীর অস্ত্রবোঝাই সাতটি জাহাজের একটি বহর ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট টাঙ্গাইলে ধলেশ্বরী নদীর সিরাজকান্দি ঘাটে নোঙর করে। এই খবরে কাদেরিয়া বাহিনীর কমান্ডার হাবিবুর রহমান ও তার দল ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা জাহাজগুলোর ওপর আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। ১১ আগস্ট সেখান থেকে জাহাজগুলো আবার যাত্রা শুরু করলে হাবিবের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধাদের দলটি সুযোগ খুঁজতে থাকে। হাবিবের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের দলটি অবস্থান নেয় মাটিকাটায় যমুনা নদীর তীরে। ১২ আগস্ট সকাল ১১টার দিকে সেখান দিয়ে যাওয়ার পথে তিনটি ছোট জাহাজ বেশ কিছুদূর সামনে চলে যাওয়ার পর অস্ত্রবোঝাই দুটি জাহাজ কাছাকাছি এলেই গর্জে ওঠে মুক্তিযোদ্ধাদের এলএমজি। এতে জাহাজ দুটির ওপরে বসে থাকা পাকিস্তানি সেনারা হকচকিত হয়ে পড়ে এবং গুলিবিদ্ধ হয়ে তাদের কেউ জাহাজের ওপরই মারা যায়; কেউ বা গুলি খেয়ে নদীতে পড়ে। আর সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া জাহাজের আরোহী হানাদাররা ভয় পেয়ে আর পেছনে না ফিরে চলে যায়। এই যুদ্ধজয়ের পর মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা অস্ত্রবোঝাই জাহাজে উঠে বিপুল অস্ত্রের সম্ভার দ্রুত নামাতে শুরু করেন। এই কাজে সহযোগিতায় এগিয়ে আসে মুক্তিকামী গ্রামবাসী। একপর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধারা জাহাজ দুটিতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে উদ্ধারকৃত অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নিরাপদে সরে যান। জাহাজের লগবুক ও মুভমেন্ট অর্ডারের হিসাব অনুযায়ী, দখল করা জাহাজ দুটিতে ২১ কোটি টাকা মূল্যের নানা ধরনের চায়নিজ, ব্রিটিশ ও মার্কিন অস্ত্রশস্ত্র ছিল। এই অভিযানে সংগৃহীত অস্ত্রগুলো টাঙ্গাইলের মুক্তিযোদ্ধাদের পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে ব্যবহৃত হয়েছে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

ব্রেকিং নিউজঃ