টাঙ্গাইলে এ পর্যন্ত ৭৩ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে

শেয়ার করুন

এম কবির ॥
টাঙ্গাইলে গত ২৪ ঘন্টায় বৃহস্পতিবার (১৪ মে) পর্যন্ত নতুন করে ১৩ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। জেলায় মোট ৭৩ জনের দেহে করোনার ভাইরাসে শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ভূঞাপুরে ৫, সখীপুরে ৬, নাগরপুরে ৪, মির্জাপুরে ২, টাঙ্গাইল সদরে ১ ও মধুপুরে ১ জনসহ মোট ১৯ জন সুস্থ হয়েছে। আর ঘাটাইলে ২ ও মির্জাপুরে ১ জনসহ মোট ৩ জন করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এদিকে গত (৭ এপ্রিল) থেকে টাঙ্গাইল জেলা লকডাউন ঘোষনা করা হয়। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) পর্যন্ত লকডাউনের ৩৭তম দিন অতিবাহিত হয়েছে।
এনায়েত করিম বিজয়, বাসাইল প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক নারী পরিছন্নকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকালে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফিরোজুর রহমান এ তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন। আক্রান্ত ওই পরিছন্নকর্মী বাসাইল উত্তরপাড়া (কবরস্থান মোড়) এলাকার বাসিন্দা। ডা. ফিরোজুর রহমান টিনিউজকে বলেন, গত (১২ মে) ৮ জনের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়। পরে বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকালে সিভিল সার্জন অফিস থেকে একজনের নমুনায় করোনা পজিটিভের বিষয়টি জানানো হয়। ওই পরিছন্নকর্মীর বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে। তিনি সুস্থ থাকায় তাকে বাড়িতে রাখা হয়েছে।
সোহেল রানা, কালিহাতী প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে নতুন করে পুলিশের এক এএসআই করোনা ভাইরাসের আক্রান্ত হয়েছেন। এ নিয়ে এ উপজেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ালো ৪ জনে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সাইদুর রহমান। তিনি ডিএমপি পল্লবী থানার এএসআই বলে জানা গেছে। মুঠোফোনে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও আক্রান্ত ওই পুলিশ সদস্যের নিকট থেকে জানা যায়, গত (৯ মে) তিনি জ্বর নিয়ে সংশ্লিষ্ট ওই থানা থেকে কাউকে কিছু না বলে তার নিজ বাড়ী বাগুটিয়া না গিয়ে কালিহাতী পৌর এলাকার সালেংকা জেলে পাড়া তার ভাড়া বাসায় চলে আসে। পরে গত (১১ মে) তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তার নমুনা পরীক্ষার জন্য দিয়ে আসলে কর্তৃপক্ষ গত (১২ মে) নমুনাটি ঢাকার আইপিএইচএ পাঠিয়ে দেন এবং গত (১৩ মে) সকালে তার নমুনা পরীক্ষার ফলাফল পজেটিভ আসে। পরে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট শাহরিয়ার রহমান তার ভাড়া বাসা সহ দুইটি বাসা লকডাউন করে দেয় এবং তিনি হোম আইসোলেশনে থাকবে বলে জানান তিনি।
নজরুল ইসলাম, ঘাটাইল প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে করোনা উপস্বর্গ নিয়ে মারা যাওয়া আব্দুল মান্নান খান (৪৫) নামে এক নিরাপত্তা কর্মী করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। মৃত ব্যাক্তির নমুনা পরীক্ষা করার পর তার করোনা পজেটিভ ছিল বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সাইফুর রহমান খান। ঘাটাইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হায়দর আলী টিনিউজকে জানান, করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া আব্দুল মান্নান খান (৪৫) উপজেলার নরজনা গ্রামের মোতাহের হোসেন খানের ছেলে। সে ঢাকার একটি ঔষধ কোম্পানীর (ওরিয়ন লিঃ) প্রধান কার্যালয়ে নিরাপত্তা প্রহরী হিসাবে কর্মরত ছিল। সে করোনা উপস্বর্গ নিয়ে সম্প্রতি গ্রামের বাড়িতে আসে। অসুস্থ অবস্থায় গত (১০ মে) তিনি মারা যান। মারা যাওয়ার পর স্বাভাবিক নিয়মেই তাকে দাফন করে পরিবারের লোকজন ও গ্রামবাসী। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সাইফুর রহমান খান টিনিউজকে জানান, করোনা উপস্বর্গ নিয়ে আব্দুল মান্নান মারা যাওয়ার পর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি টিম তার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকা পাঠায়। গত (১২ মে) আইডিসিইআর থেকে পাঠানো রির্পোটে তার করোনা পজেটিভ আসে।
এদিকে একই দিনের রির্পোটে উপজেলার সংগ্রামপুর ইউনিয়নের কাউটেনগর গ্রামের মৃত নুর মোহাম্মদের স্ত্রী সরবানু (৭০) এর নমুনা পরীক্ষার রির্পোটে করোনা পজেটিভ এসেছে। সে ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নমুনা প্রদান করেছিলেন বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অঞ্জন কুমার সরকার টিনিউজকে বলেন, করোনায় আক্রান্ত উপজেলার ঘাটাইল ইউনিয়নের নরজনা গ্রামের মৃত আব্দুল মান্নান খানের বাড়ির আশে পাশের ১০ বাড়ি লকডাউন ঘোষনা করা হয়েছে। অপরদিকে সংগ্রামপুর ইউনিয়নের কাউটেনগর গ্রামের করোনায় আক্রান্ত সরবানু বেগমকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আইসোলেশনে রাখা হবে। তার সংস্পর্শে আসা আশে পাশের বাড়িগুলি লকডাউন ঘোষনা করা হবে।
নূর আলম, গোপালপুর সংবাদদাতা জানান, টাঙ্গাইলের গোপালপুরে নতুন করে দু’জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তারা হলো- উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান সোহেল ও শহর আওয়ামী যুবলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান টগর। তাদের বাসাসহ আশপাশের কয়েক বাসা লডডাউনের আওতায় আনার প্রস্ততি চলছে। এ নিয়ে উপজেলায় ওসি ও ফার্মাসিস্টসহ মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ালো ৭ জনে। গোপালপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলীম আল রাজি লিটন টিনিউজকে জানান, করোনার উপসর্গ থাকায় গত (১২ মে) তাদের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকালে পরীক্ষার ফলাফলে তাদের কোভিড-১৯ পজিটিভ আসে। আক্রান্তদের মধ্যে কামদেববাড়ীর গার্মেন্টকন্যার পরবর্তী নমুনা পরীক্ষায় ফলাফল নেগেটিভ পাওয়া গেছে। গোপালপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বিকাশ বিশ্বাস টিনিউজকে জানান, আক্রান্ত ব্যক্তিদের বাসাসহ আশপাশের কয়েকবসা লডডাউনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এছাড়া গত ২৪ ঘন্টায় বৃহস্পতিবার (১৪ মে) পর্যন্ত মির্জাপুর উপজেলা ৫ জন, মধুপুরে ১ জন এবং ধনবাড়ী উপজেলায় ১ জন নতুন করে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে।
এদিকে করোনা ভাইরাসের পরীক্ষার জন্য টাঙ্গাইলের বিভিন্ন উপজেলা থেকে ৩২৭৭ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) নতুন করে ১৭৬ জনের নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এদের রেজাল্ট আগামীকাল শুক্রবার (১৫ মে) পাওয়া যাবে। গত ২৪ ঘন্টায় নতুন করে ১৩ জন করোনা আক্রান্ত হয়েছে। হোম কোয়ারেন্টাইনের আওতায় আনা হয়েছে ১২৪ জনকে। ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে ১০১ জনকে। এর মধ্যে বুধবার (১৩ মে) ১২৭ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১৩ জনের করোনার রেজাল্ট প্রজেটিভ এসেছে। এখন পর্যন্ত ২৯০১ জনের রিপোর্ট হাতে পেয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। এদের মধ্যে ৭৩ জনের ফলাফল প্রজেটিভ এসেছে। বাকিগুলোর ফলাফল নেগেটিভ এসেছে। বর্তমানে জেলায় মোট ৭৩ জন ব্যক্তি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে ৭ জনকে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের ৫০ বেডের করোনা ডেডিকেডেট ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিরা ঢাকা, ময়মনসিংহ হাসপাতালে ও বাসায় চিকিৎসাধীন রয়েছে।
এ ব্যাপারে টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান টিনিউজকে বলেন, টাঙ্গাইল জেলায় এ পর্যন্ত ৭৩ জন করোনা ভাইরাস রোগী সনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে মির্জাপুরে ১৪, দেলদুয়ারে ১০, নাগরপুরে ৯, ভূঞাপুরে ৭, সখীপুরে ৬, গোপালপুরে ৬, ধনবাড়ীতে ৫, টাঙ্গাইল সদরে ৪, কালিহাতীতে ৪, ঘাটাইলে ৪, মধুপুরে ৩ ও বাসাইলে ১ জন রয়েছে। এদের মধ্যে ভূঞাপুরে ৫, সখীপুরে ৬, নাগরপুরে ৪, মির্জাপুরে ২, টাঙ্গাইল সদরে ১ ও মধুপুরে ১ জনসহ মোট ১৯ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এছাড়া জেলার ঘাটাইলে মহিউদ্দিন, আব্দুল মান্নান খান ও মির্জাপুরে রেনু বেগম নামে ৩ জন মারা গিয়েছে। জেলার ১২টি উপজেলাতে এখন করোনায় আক্রান্ত রোগী রয়েছে।
জেলায় এখন পর্যন্ত ৭৭৯৪ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনের ও হাসপাতালে কোয়ারেন্টাইনের আওতায় আনা হয়েছিল। এদের মধ্যে ৬ হাজার ৩০৯ জনকে কোয়ারেন্টাইন থেকে ছাড়পত্র নিয়েছে। বর্তমানে কোয়ারেন্টাইনে রয়েছে ১ হাজার ৪৮৫ জন। করোনায় আক্রান্ত হয়ে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের ৫০ বেডের করোনা ডেডিকেডেট ইউনিটে ভর্তি রয়েছে ৭ জন।
উল্লেখ্য, গত (১ মার্চ) থেকে এখন পর্যন্ত বিদেশে থেকে জেলায় এসেছে ৫ হাজার ৬৫২ জন। কোভিড-১৯ চিকিৎসায় প্রস্তুত রয়েছে জেলার সরকারী হাসপাতালের ৫০টি বেড, উপজেলা পর্যায়ে আইসোলেশন বেড রয়েছে ৫৮টি। ডাক্তার রয়েছে ২৪২ জন, নার্স রয়েছে ৪১৯ জন, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সমগ্রী পিপিই মজুদ রয়েছে ৭ হাজার ৩৪ টি ও করোনা আক্রান্ত রোগী আনা নেয়া করার জন্য এ্যাম্বুুলেন্স রয়েছে ২টি।
এছাড়া জেলায় এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯৫০ পরিবারের মধ্যে ১৪৭৯ মে.টন চাল ও ৩৭ হাজার ৪০টি পরিবারের মধ্যে নগদ ৭৪ লাখ ৮ হাজার ৩৫ টাকা ও শিশু খাদ্য বাবদ ৯ হাজার ২৫৫ পরিবারকে ১৪লাখ ২৮ হাজার ৫০৫ টাকা প্রদান করেছে জেলা প্রশাসন।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

ব্রেকিং নিউজঃ