টাঙ্গাইলে অবৈধ অটোরিক্সা বৈধতা দিতে কোটি কোটি টাকা বানিজ্য

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥
সিন্টিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা বাণিজ্য করে টাঙ্গাইল পৌরসভা অবৈধ অটোরিক্সাকে বৈধতা করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। সরকারিভাবে পৌরসভার ফি ১০ হাজার ৫০০ টাকা নেয়ার কথা থাকলেও প্রতিটি অটোরিক্সার প্লেট ৮০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছে পৌর কর্তৃপক্ষ। ফলে আগের চেয়ে আরো এক হাজার অটোরিক্সা বৃদ্ধি করায় এক তৃতীয়াংশ অটোরিক্সার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। এতে করে আগের যেকোন সময়ের তুলনায় যানজট বেশি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা যায়, দিনদিন টাঙ্গাইলে ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। অতিরিক্ত অটোরিক্সা বেড়ে যাওয়ায় যানজটের শহরে পরিণত হয়েছে টাঙ্গাইল পৌর এলাকা। এছাড়া ইজিবাইকের বেপরোয়া চলাচল ও চালকের অদক্ষতার কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। যানজটের চরম ভোগান্তি ও দুর্ভোগ থেকে শহরবাসীকে রেহাই দিতে বিগত ২০১৮ সালের এপ্রিল মাস থেকে ৩ হাজার অটোরিক্সাকে দুই শিফটে ভাগ করে দেয়া হয়। এক হাজার পাঁচশ অটোরিক্সাকে লাল রং ও অপর এক হাজার পাঁচশ অটোরিক্সাকে হলুদ রঙে চিহিৃত করে দেয়া হয়। সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এক রঙের অটোরিক্সা চলবে। আর দুপুর ২টা হতে রাত ৮টা পর্যন্ত অপর অটোরিক্সাগুলো শহরে চলাচল করতে হবে। দুই শিফট করার পরও টাঙ্গাইল শহরে অটোজট লেগেই থাকে। করোনা ভাইরাসের কারণে টাঙ্গাইল শহরে মানুষের যাতায়াত কমে গেছে। তাই অটোরিক্সার সংখ্যাও কম। এই সুযোগে টাঙ্গাইল পৌরসভা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগসাজস করে আরো এক হাজার অবৈধ অটোরিক্সাকে বৈধতা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু কোন অটোরিক্সার মালিক সরাসরি নম্বর প্লেট নিতে পারবে না। কাউন্সিলর বা তাদের সিন্ডিকেটের কোন সদস্যদের মাধ্যমে ৮০ হাজার টাকা থেকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে সেই নম্বর পত্র নিতে হবে। কোন অটোরিক্সার মালিককে সরাসরি নম্বর প্লেট দেয়া হয় না।
পৌরসভার একটি সূত্র জানায়, এক হাজার অটোরিক্সার নম্বর প্লেটের প্রশাসন থেকে শুরু করে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাদের মাঝে বন্টন করে দেয়া হয়। এর মধ্যে পৌরসভার কয়েকজন কাউন্সিলর ও একজন প্যানেল মেয়রও রয়েছেন। আর এই প্যানেল মেয়রের মাধ্যমেই বেশিরভাগ নম্বর প্লেট বিতরণ করা হয়। আবার তিনি নিজেই তার সহযোগীদের দিয়ে সেগুলো বিক্রি করে যাদের নামে বরাদ্দ তাদের কাছে টাকা পৌছে দেয়া হয়েছে।
টাঙ্গাইল ট্রাফিক পুলিশের একজন সার্জেন টিনিউজকে জানান, দিন দিন শহরে ব্যাটারী চালিত অটোরিক্সা বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি পৌর কর্তৃপক্ষ এক হাজার অটোরিক্সার লাইসেন্স দিয়েছেন। আর সেগুলো ৮০ থেকে এক লাখ টাকায় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিক্রি করেছেন। এখন করোনার কারনে সেই রেজিস্ট্রশনের মূল ৭০ হাজারে নেমে এসেছে। আমাদেরতো এ বিষয়ে কিছুই করার নেই। আমাদের দায়িত্ব শহর যানজটমুক্ত রাখা। কিছু বলতে গেলেই উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি করতে হয়।
কাগমারী এলাকার সুনীল টিনিউজকে বলেন, আমি প্রতিদিন ৩০টি অটোরিক্সার নম্বর প্লেট ভাড়া দেই। প্রতি প্লেট প্রতিদিনের ভাড়া ৮০-১০০ টাকা। আমার নিজের নামেও আছে কিছু। আর বেশ কয়েকজনের প্লেট নিয়ে এসে ভাড়া দিয়ে থাকি। বর্তমানে পৌরসভার প্লেট পাওয়া খুব দুর্লভ বিষয়। পুরাতন প্লেট এক লাখ টাকা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাঙ্গাইল পৌরসভার এক কর্মচারী টিনিউজকে বলেন, সরাসরি প্লেটের জন্য গেলে পৌর কর্তৃপক্ষ দিবে না। পৌরসভার কাউন্সিলর বা পৌর কর্তৃপক্ষের কোন কর্মকর্তার মাধ্যমে প্লেট নিতে হবে। তা না হলে বছরের পর বছর ঘুরেও প্লেট পাওয়া যাবে না। কাউন্সিলররা তাদের ভাগের প্রতি প্লেট এক লাখ থেকে শুরু করে এক লাখ ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছে। ৩৫৪৫ নম্বর প্লেটের মালিক মিলন নামের এক ব্যক্তি টিনিউজকে জানান, তার কাছে বেশকয়েকটি নতুন ও পুরাতন লাইসেন্স রয়েছে। সেগুলো তিনি ভাড়া এবং বিক্রি করেন। তবে নতুনের চেয়ে (তিন হাজারের উপরে) পুরাতন লাইসেন্সের চাহিদা বেশি। কারণ পুরাতন লাইসেন্স (এক থেকে তিন হাজারের মধ্যে সিরিয়াল) প্রতিটি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে এক লাখের মধ্যে। কারণ এগুলো ডিজিটাল প্লেট। আর নতুনগুলোর দাম প্রতিটি ৬০ থেকে ৭০ হাজারের মধ্যে। কারণ এগুলো এখনো ডিজিটাল প্লেট হয়নি। পৌরসভার কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের জোগসাজসে অতিরিক্ত এক হাজার লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। এগুলোর কোন বৈধতা নেই। শুধু স্টিকার দিয়েই চলছে এসব অবৈধ ব্যাটারী চালিত অটোরিক্সা।
৩৬০১ নম্বর প্লেটের মালিক আলামিন নামের এক অটোরিক্সা চালক টিনিউজকে জানান, তিনি গত ছয় মাস আগে তিনি এক লাখ টাকা দিয়ে ওই নম্বর প্লেটটি কিনেছেন। তবে তাকে এখন পর্যন্ত ডিজিটাল নম্বর প্লেট দেয়া হয়নি। ৩২৭৭ সিরায়ালের নম্বর প্লেটটিও আরোক চালক মোসলেম উদ্দিন প্রতিদিন ৬০ টাকা করে ভাড়া দিয়ে অটোরিক্সা চালাচ্ছেন। ৩৮৯৫ সিরিয়ালের মালিক সোনা মিয়া টিনিউজকে জানান, তিনি ৯৫ হাজার টাকায় এটি একজন কাউন্সিলরের মাধ্যমে কিনেছেন। এখন তিনি এটি প্রতিদিন ৬০ টাকা করে ভাড়া দিচ্ছেন। তার কাছে আরো দুইটি রয়েছে। সেগুলোও মাসিক হিসেবে ভাড়া দেয়া হয়েছে।
টাঙ্গাইল পৌরসভার সহকারি কর আদায়কারী রনজিত চন্দ্র পাল টিনিউজকে জানান, প্রতিটি অটোরিক্সার লাইসেন্স নতুন নিবন্ধন করতে হলে সরকারি ফি ১০ হাজার ৫০০ টাকা এবং নবায়ন করতে ভ্যাটসহ এক হাজার ৭২৫ টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে শহরে কতগুলো অটোরিক্সা রয়েছে এবং নতুন নিবন্ধনের জন্য সরকারি ফি’র অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছেন কি না এ বিষয়ে তিনি কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

ব্রেকিং নিউজঃ