গ্রামে টাঙ্গাইল ও নাগরপুরে কলা গাছের শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি

শেয়ার করুন

নোমান আব্দুল্লাহ/ স্টাফ রিপোর্টার, নাগরপুর ॥
অজপাড়াগাঁয়ের বিদ্যালয়ে ইট-পাথরের শহীদ মিনার নেই তো কি হয়েছে। নিজ হাতে গড়া কলাগাছের প্রতীকী শহীদ মিনারেই শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেছে। শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) টাঙ্গাইলের বিভিন্ন উপজেলার ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা তাদের তৈরি শহীদ মিনারে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। টাঙ্গাইল ও নাগরপুর জেলার বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে শিশুরা কাঁদামাটি, কলাগাছ, বাঁশের কঞ্চি ও রঙিন কাগজ দিয়ে শহীদ মিনার তৈরি করেছে। শহীদ মিনার করতে সময় লেগেছে ২-৩ দিন। শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকালে সেই শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। শিশুদের বয়স ৫-১২ বছরের মধ্যে। প্রথম থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী তারা।
শিশুরা টিনিউজকে জানায়, তারা নিজ উদ্যোগেই শহীদ মিনার গড়ার কাজে লেগে পড়ে। স্কুলে যাওয়ার কারণে সকাল থেকে দুপুরে বিরতি দিতে হয়েছে তাদের। বৃহস্পতিবার (২০ ফেব্রুয়ারি) বিকেলেই গড়ে ওঠে শহীদ মিনার। শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে তারা। এদের দেখাদেখি পরে যুবক ও প্রবীণরাও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়।
শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকালে টাঙ্গাইল পৌর এলাকার কাগমারা, এনায়েতপুর, বেড়াডোমা, দাইন্যা ইউনিয়নের বাইমাইল, বাসারচর, চিলাবাড়ি, বাঘিল ইউনিয়নের ধরেরবাড়ী, দুরিয়াবাড়ি, বানিয়াবাড়ি, কৃষ্ণপুর ও গালা ইউনিয়নের ভাটচান্দা, সদুল্লাপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে শিশুদের উদ্যোগেই শহীদ মিনার তৈরি করা হয়েছে। কলাগাছের তিনটি খুঁটি মাটিতে পুঁতে তৈরি করা শহীদ মিনার চোখে পড়ে। প্রতিটি মিনারের ওপর অপেক্ষাকৃত ছোট কলাগাছের আরও তিনটি টুকরা তির্যকভাবে আটকে দেয়া হয়েছে। রঙিন কাগজ ও নানা রঙের ফুল দিয়ে প্রতিটি মিনার মুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। চারপাশে সুতা টানিয়ে তাতে রঙিন কাগজ ও বেলুন দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। শহীদ বেদীতে বুনোফুল ছাড়াও কিছু গাঁদা ও গোলাপফুলও চোখে পড়েছে। পাশেই সাউন্ড সিস্টেম বাজছে। সাউন্ড সিস্টেমে দেশাত্মবোধক গান বাজানো হচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা টিনিউজকে আরও জানিয়েছে, স্কুলের শিক্ষক, অভিভাবক ও বড়দের কাছ থেকে শহীদ দিবসের তাৎপর্য সম্পর্কে জেনেছে। তাই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য শহীদ মিনার বানিয়েছে শিশুরা। কাগমারা এলাকার চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী জিহাদ মিয়া টিনিউজকে বলে, তাদের গ্রামে শহীদ মিনার নেই। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে হলে যেতে হয় তিন কিলোমিটার। তাই শহীদ মিনার তৈরি করেছে তারা। তাদের কাজ দেখে প্রথমে কেউ উৎসাহ না দিলেও পরে বাড়ির দাদি, নানি, মা, চাচি ও বড় ভাইবোনেরা সাহায্য করেছেন। ধরেরবাড়ী গ্রামের তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী আব্দুল মানিক টিনিউজকে বলে, আমরা শিক্ষকদের কাছে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ইতিহাস জেনেছি। তাই শহীদ মিনারের আঙিনায় জুতা খুলে খালি পায়ে প্রবেশ করেছি। ধরেরবাড়ী গ্রামের নার্গিস নামের এক অভিভাবক টিনিউজকে বলেন, গ্রামে স্থায়ীভাবে কোন শহীদ মিনার নেই। শহীদ মিনার থাকলে সবাই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারতাম। এতে শিশুরা দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হতো। দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী সামিয়া টিনিউজকে বলেন, তাদের বাড়িতে ছিল হলুদ গাঁদাফুল ও লাল গোলাপ ফুল। তার বাড়ি থেকে এনে শহীদ বেদীতে শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। কাগমারা গ্রামের বাসিন্দা মামুন মিয়া টিনিউজকে বলেন, এই শিশুদের দেশপ্রেম দেখে অভিভূত হয়েছি। মিনারটিতে প্রত্যেকের দেয়া একেকটি ফুলে মিশে রয়েছে তাদের শ্রদ্ধা আর অগাধ ভালোবাসা।
এদিকে টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার পোষ্টকামারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকালে নিজেদের তৈরি শহীদ মিনারের বেদীতে তারা পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে। এর আগে বৃহস্পতিবার (২০ ফেব্রুয়ারি) দিনভর ওই বিদ্যালয়ের ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা তৈরি করেন এ শহীদ মিনার। বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রত্যন্ত এ অঞ্চলে বিগত ১৯৭৮ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর বিগত ২০১৩ সালে এটি জাতীয়করণ করা হয়। বিদ্যালয়টির দুটি ভবনের একটি জরাজীর্ণ। এদিকে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার এত বছরেও নির্মাণ করা হয়নি কোন শহীদ মিনার।
দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ কোমলমতি শিক্ষার্থীরা টিনিউজকে জানায়, বিদ্যালয়ে কোন শহীদ মিনার নেই বলে তারা জাতীয় দিবসগুলোতে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারে না। এজন্য নিজেরাই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কলা গাছে কাগজ মুড়িয়ে প্রতীকী শহীদ মিনার তৈরি করেছে। পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মামুদুল হাসান, আয়শা আক্তার ই্ররহিম মিয়া টিনিউজকে বলেন, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তারা সবাই শহীদ মিনারে যাবে। কিন্তু তাদের বিদ্যালয়ে যেহেতু শহীদ মিনার নেই। তাই তারা কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলে কলা গাছের এ শহীদ মিনার বানিয়েছে। বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক ডলি রানী মন্ডল টিনিউজকে বলেন, শহীদ মিনার মূলত একটা প্রতীক মাত্র। তাই ইটের হোক আর কলা গাছেরই হোক, শ্রদ্ধা নিবেদনটাই মূখ্য। এটা করতে পেরে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা অনেক তৃপ্ত হয়েছে বলে আমরা লক্ষ্য করেছি।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিভা রানী ঘোষ টিনিউজকে বলেন, সরকারি অনুদান না পাওয়ায় অবকাঠামোসহ শহীদ মিনার তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীরা নিজেরাই কলা গাছ দিয়ে শহীদ মিনার তৈরি করে সেখানে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়েছে।
এ ব্যাপারে নাগরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ ফয়েজুল ইসলাম টিনিউজকে বলেন, অচিরেই উপজেলার যে সকল বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নেই, সেখানে শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হবে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

ব্রেকিং নিউজঃ